শনিবার, ১৬ জানুয়ারী ২০২১, ১১:১৩ অপরাহ্ন

বিজয়ের ৪৯বছর পরও শিবগঞ্জে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকাশিত হয়নি

মোহা. সফিকুল ইসলাম, শিবগঞ্জ
  • আপডেট টাইম শুক্রবার, ২৫ ডিসেম্বর, ২০২০
  • ১২৭ বার পঠিত

স্বাধীনতা উত্তরকালে সংসদ সদস্যসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে বীরমুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হলেও স্বাধীনতার ৪৯বছর পরও শিবগঞ্জের কোন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষাবিদ, রাজনীতিবিদসহ খ্যাতিমানদের নামে কোন স্থাপনার নাম করণ, স্মৃতিফলক নির্মাণ, গণকবর সংরক্ষণ, পর্যাপ্ত শহীদ মিনার নির্মাণ না হওয়ায় শিবগঞ্জের শতাধিক বীর মুক্তিযোদ্ধাসহ বিভিন্ন পেশা ও শ্রেণীর মানুষের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। সমস্যগুলো সমাধানের জন্য প্রায় দুই বছর আগে এলাকার কলেজ শিক্ষক সফিকুল ইসলাম স্থানীয় সংসদ বরাবর আবেদনও করেছেন। মুক্তিযোদ্ধাসহ বিভিন্ শ্রেণীর মানুষের সাথে কথা বলে ও আবেদন সূত্রে জানা গেছে, শিবগঞ্জে প্রায় শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সহস্রাধিক প্রতিষ্ঠান থাকলে মাত্র ১২/১৩টি শহীদ মিনার রয়েছে। তার মধ্যে নদী ভাঙ্গন কবলিত এলকায় স্থায়ী ও অস্থায়ী কোন শহীদ মিনার না থাকায় তাদের অনেকেই বুঝে না জাতীয় দিবস কি বা শহীদ মিনারের মর্যদা কি? এই প্রসঙ্গে তেমন কোনো ধারণ নাই বলে চলে এমন দাবি আবেদনকারী কলেজ সফিকুল ইসলামের।

এমনকি শিবগঞ্জ উপজেলা চত্বরেও দীর্ঘদিন যাবত শহীদ মিনার নেই। ফলে অস্থায়ী শহীদ মিনার তৈরী করে জাতীয় দিবসগুলোতে পুস্পস্তবক অর্পণ ও অন্যান্য অনুষ্ঠানাদির কাজ চলে।

১৯৭১সালে মুুক্তিযোদ্ধা চলাকালীন শিবগঞ্জের অনেক মুক্তিযোদ্ধা পাকবাহিনীর হাতে শহীদ হলে তাাদের তালিকা এখনো নেই বা তাদের নামে স্মৃতিফলকও নেই। শিবগঞ্জে ৪শ কি. মি. পাকা রাস্তা ও প্রায় ৯’শ কি.মি. কাঁচা রাস্তা সহ শতাধিক ব্রীজ, কালভাট থাকলেও কোন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা বা শিক্ষাবিদ বা প্রখ্যাত রাজনীতিবিদের নামে কোন রাস্তা, কালভার্ট ও ব্রীজের নাম করণ হয়নি। তালিকা করা হয়নি গণকবরেরও। শিবগঞ্জের গণকবরগুলো এখনো রয়েছে অরক্ষিত। সংরক্ষণের কোন ব্যবস্থা নেই। কোন কোন গণকবর রাজাকারদের জমিতে থাকায় একেবারে বিলিন হয়ে গেছে। আবার কোন কোনটি কালের স্বাক্ষ্য হিসাবে কিছুটা পরিচয় বহন করছে। হয়নি কোন গণকবরেরও তালিকা।

এব্যাপারে পারচৌকা গ্রামের ৭১সালে শহীদ মুসলিম উদ্দিনের ছেলে বদিউর রহমান জানান, আমার পিতা ও আপন ৫জন চাচাসহ ১৩ জন নিরহ মানুষকে হত্যা করে হুমায়ুন রেজা উচ্চ বিদ্যালয়ের পিছনে এক রাজাকারের জমিতে সামান্য গর্ত করে পুঁতে রাখে। যা আজও সংরক্ষণ হয়নি। স্থানীয় কোন নেতা ও ইউপি চেয়ারম্যান এখন পর্যন্ত কোন পদক্ষেপ গ্রহণও করেননি। আমার শেষ ইচ্ছা মৃত্যুর আগে যেন গণকবরটি সংরক্ষণ দেখতে পাই।

অন্যদিকে, মোবাকরপুর ইউনিয়নের কলাবাড়িতে প্রায় ১শ নিরহ মানুষের গণবরটি আজও অরক্ষিত। যদি বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর এমপি ও সমাজ সেবা অফিসার স্থানটি পরিদর্শন করেছেন বলে জানান গণকবরে জমিদাতার ছেলে আহসান হাবিব। এই গণকবরের সমাহিত কোন শহীদদের তালিকা। গণকবরগুলোতে শহীদদের আত্মীয়রা প্রতিবছরই ্উপস্থিত হয়ে শুধু চোখের অশ্রু ফেলা ছাড়া আর কিছুই পায়নি। শিবগঞ্জের অনেক শহীদ মুক্তিযোদ্ধার পরিবার শহীদের ভাতা থেকে বঞ্চিত রয়েছে জানা গেছে। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, শিবগঞ্জে এপর্যন্ত কোন রাজাকারের তালিকা তৈরী হয়নি। কথিত আছে, ৭১ সালে শিবগঞ্জে প্রায় ৪ হাজার রাজাকার ছিল। তারা এখনো বিভিন্ কৌশলে বহাল তবিয়তে রয়েছে। প্রায় প্রতিটি রাজাকার পরিবার ছলে বলে কৌশলে তাদের স্বার্থ উদ্ধার করে চলেছে।
আবেদন সূত্রে আরো জানা গেছে, শিবগঞ্জ উপজেলার কেন্দ্রীয় ও ইউনিয়ন পর্যায়ে কোন গণগ্রন্থগার নেই। ফলে যুবক সম্প্রদায় মাদকসহ বিভিন্ন ধরনের অসামাজিক কাজে লিপ্ত হচ্ছে। উপজেলা কেন্দ্রীয় ও ইউনিয়ন পর্যায়ে গণগ্রন্থগার থাকলে যুবকরা সেখানে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধার স্বপক্ষের বই, ছড়া, কবিতা ও পত্রিকা পড়লে অনেকেই মাদকের জগত থেকে ফিরে আসতে পারে।

শিবগঞ্জ উপজেলার সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার বজলার রহমান সনু বলেন, দুঃখজনক হলেও সত্য যে স্বাধীনতার ৪৯বছর পরও শিবগঞ্জে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকশিত হয়নি। যদিও স্বাধীনতা উত্তরকালে বার বার বিভিন্ন পদে মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষেরই জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি আরো বলেন, শিবগঞ্জে শহীদ মিনার না থাকা, শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা না থাকা, স্মৃতিফলক না থাকা, তাদের স্মরণে কোন রাস্তা, কালভার্র্ট ব্রীজ বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নাম করণ না থাকা, রাজাকারদের তালিকা না থাকা কেন সরকারী গণগ্রন্থতার না থাকা আমাদের জন্য অত্যন্ত লজ্জার কথা।

শুধু বজলার রহমান সনুই নয়, শিবগঞ্জ উপজেলার ১৫টি ইউনিয়ন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারগণসহ শিবগঞ্জ উপজেলার বীর মুক্তিযোদ্ধ জোাবদুল হক, প্রভাত সিংহ, মোয়াজ্জেম হোসেন মুন্টু, আব্দুল মান্নান, আশরাফুল মাস্টার, তরিকুল ইসলাম মাস্টার, ইসহাক আলী, আবুল হোসেন, মোহবুল হক, আব্দুল লতিফ, আহসান আলী মাস্টারসহ শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং উপরোক্ত সমস্যগুলো সমাধানে জন্য জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্ট উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি কামনা করেন।

এব্যাপারে শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাকিব আল রাব্বী জানান, শহীদ মিনার নির্মাণ, শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের নামের তালিকা ও স্মৃতিফলক তৈরী ও গণকবরের তালিকা তৈরী হয়েছে এবং অল্প সময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন হবে। তবে রাস্তা, ঘাট, ব্রীজ ও অন্যান্য স্থাপনের ক্ষেত্রে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের, শিক্ষাবিদ ও প্রখ্যাত রাজনীতিবিদের নাম নামকরণের ব্যাপারে এপর্যন্ত কোন আলোচনা হয়নি। সুযোগমত আমরা উপজেলা পরিষদের সভায় আলোচনা করবো। রাজাকারের তালিকা ও গণগ্রন্থগারের ব্যাপারে সঠিকভাবে আমার কিছু জানা নেই।

এব্যাপারে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যন সৈয়দ নজরুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, এটি আমাদের জন্য একদিকে যেমন লজ্জার ব্যাপার, অন্যদিকে তেমনি আমাদের সকলের ব্যর্থতা। তিনি আরো বলেন, আমি ইতিমধ্যে আমাদের সংসদ সদস্য ডা. সামিল উদ্দিন আহমেদ শিমুলের সাথে আলোচনা করেছি। তিনি আশ্বাস দিয়েছেন। আমরা সকলেই সম্মিলিত ভাবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বিকশিত করতে উপরোক্ত কাজগুলো বাস্তবায়নের চেষ্টা করবো ইনশাল্লাহ।

স্থানীয় সংসদ সদস্য ডা. সামিল উদ্দিন আহমেদ শিমুল বলেন, অল্প কিছুদিনের মধ্যে উপজেলা পরিষদ চত্বরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার নির্মাণের কাজ শুরু হবে। ইউনিয়ন পর্যায়ে শহীদ মিনার নির্মাণের ব্যাপারে প্রতিটি ইউপি চেয়ারম্যানের নিকট জায়গা বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। তবে, মনাকষা ইউপি চেয়ারম্যান মির্জা শাহাদাৎ হোসেন খুররম মনাকষা বাজারে শহীদ মিনার নির্মাণের মত স্থান নেই বলে জানিয়েছেন। অন্যান্য ইউপি চেয়ারম্যনগণের সাথে এখনো যোগাযোগ করা হয়নি। স্থান বরাদ্দ দিলেই শহীদ মিনার নির্মাণের কাজ শুরু হবে। শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের নামের ফলক, গণকবর বাঁধাইও স্মৃতিফলক নির্মান, রাজাকারের তালিকা তৈরীসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সরকারী নির্দেশনা এসেছে, কাজ চলছে। তবে গণকবরের ক্ষেত্রে কিছু কিছু গণকবর রাজাকারের জমিতে থাকায় কিছুটা বিঘœ সৃষ্টি হয়েছে। গণগ্রন্থগার তৈরীর কথা আমাদের চিন্তাভাবনায় আছে। পদক্ষেপ গ্রহন করবো ইনশাল্লাহ।

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..

 

Copyright © All rights reserved © 2019 Kansatnews24.com
Theme Developed BY Sobuj Ali
error: Content is protected !!