শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২০, ১০:৩২ অপরাহ্ন

শুভ জন্মদিন শ্রদ্ধেয় বঙ্গমাতা

ড. জেবউননেছা
  • আপডেট টাইম শনিবার, ৮ আগস্ট, ২০২০
  • ৪৩ বার পঠিত

বেগম ফজিলাতুননেছা মুজিবকে নিয়ে লিখতে গিয়ে মনে পড়ছে, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতার কয়েকটি চরণ, ‘ওগো বর,ওগো বঁধু/ওই যে নবীনা,বুদ্ধিবিহীনা/এ তব বালিকা বধূ’। এই বালিকা বধূটি মহীয়সী নারী বেগম ফজিলাতুননেছা মুজিব ৮ আগস্ট ১৯৩০ সালে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁর পিতার নাম শেখ জহুরুল হক এবং মায়ের নাম হোসনে আরা বেগম। বঙ্গবন্ধুর পিতা শেখ লুৎফর রহমান এবং মাতা সায়েরা খাতুন তাকে স্নেহে আগলে রাখেন। স্থানীয় মিশনারি স্কুলে তিনি লেখাপড়া করেন। বঙ্গবন্ধু এন্ট্রান্স উত্তীর্ণ হবার পর ১৯৪২ সালে তাদের সংসার জীবন শুরু হয়। জাতির জনক যাকে সম্বোধন করতেন ‘রেণু’ নামে। ‘রেণু’ শব্দের অর্থ উদার। বঙ্গবন্ধু কারাগারে থাকার সময়গুলো একাকী যন্ত্রণা সয়ে সাহস জুগিয়েছেন, মানসিকভাবে সমর্থন দিয়েছেন। শত বিপদে তিনি কোনোদিন টলে যাননি। পাহাড়ের মতো অবিচল থেকেছেন। শত দুঃখ সয়ে যাওয়া এই নারী আমাদের বঙ্গমাতা। যিনি বহতা নদী। যাকে নিয়ে লিখতে চাইলে একটি গ্রন্থ লেখা যায়। তারপরও ক্ষুদ্রপরিসরে মহাসাগরে দিকে যাত্রা শুরু করছি। যে সাগর নদী এবং ঝর্ণাধারায় সমৃদ্ধ। এই মহাসাগরটি উত্তাল ঢেউয়ে ঢেউয়ে ক্ষত বিক্ষত হয়েছেন। তবু মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থেকে নিজেকে সমুন্নত রেখেছেন। তিনি আর কেউ নন। বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুননেছা মুজিব।

বঙ্গমাতা দেশের জন্য কতটা অন্তপ্রাণ ছিলেন,তাঁর অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। তিনি একজন রাজনৈতিক সচেতন নারী ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিত কালে ছাত্রলীগের নেতারা বেগম মুজিবের কাছে পরামর্শ নিতেন এবং নেতাদের তিনি বুদ্ধি পরামর্শ দিতেন এবং অনেকসময় নেতাদের ডাকতেন দলের সমস্যা শোনার জন্য। দলের সংকটকালে অর্থ সাহায্য করতেন। একটি ঘটনা উল্লেখ না করলেই নয়, ১৯৬৯ সালে লাহোরে আইয়ুব খান গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করেন। তখন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় কারাবন্দি শেখ মুজিবকে গোলটেবিলে অংশগ্রহণ করার জন্য প্যারোলে মুক্তির প্রস্তুতিকালে বেগম মুজিব প্যারোলের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। কারণ,বঙ্গমাতা বুঝতে পেরেছিলেন,আইয়ুব খানের পতন আসন্ন। আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ বেগম মুজিবকে রাজি করানোর চেষ্টা করেছেন। কিন্তু বেগম মুজিব মুক্তি না নেওয়ার ব্যাপারে বঙ্গবন্ধুকে অনুপ্রাণিত করেছেন। তাঁর এই বিস্ময়কর রাজনৈতিক দূরদর্শিতা বাঙালির গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসকে বেগবান করে। শুধু কি তাই, ১৯৭১-এর ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর বক্তব্যের বিষয়ে বঙ্গবন্ধুকে তিনি একটি কথাই বলেছিলেন, ‘তোমার যেটি মনে আসে তুমি সেটিই বলবে।’ বেগম মুজিব গান শুনতেন,বই পড়তে ভালোবাসেন। বেগম মুজিব বার্ট্রান্ড রাসেলের জীবনী পড়ে উদ্বুদ্ধ হয়ে পরবর্তীকালে তাই তাঁর পুত্র সন্তানের নাম রেখেছিলেন রাসেল। সাদাসিধে সহজ সরল জীবন ছিল বেগম মুজিবের। সেটির প্রমাণ পাওয়া যায় বঙ্গবন্ধুর আসবাবপত্র এবং ডাইনিং টেবিলে রাখা তৈজসপত্রের মাধ্যমে এবং তাঁর পরিধানকৃত শাড়ি কাপড়ে। ‘ফার্স্টলেডি’ হওয়া সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্রীয় সফরে তাকে দেখা যেতো না। ছেলেমেয়েদের কাপড় নিজে সেলাই করতেন। সুতি শাড়ি পরতেন। তিনি ভালো পান সাজাতে পারতেন। তিনি গান শুনতে ভালোবাসতেন। অর্থাভাবে এবং রাজনৈতিক কাজে ঘরের জিনিসপত্র এবং নিজের গয়না বিক্রি করে দিলেও তাঁর সংগ্রহে থাকা বাদ্যযন্ত্র বিক্রি করেননি। তাঁর নিরাভরণ জীবনের শেষ উদাহরণ, মৃত্যুর সময় তাঁর পায়ে ছিল বাথরুম স্লিপার। এমন একজন গুণসম্পন্ন নারীর উৎসাহ প্রেরণায় বঙ্গবন্ধু রাজনীতিতে নিশ্চিন্তে নিজেকে নিবেদিত করেছেন।

বঙ্গবন্ধু তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ এবং ‘কারাগারের রোজনামচা’ গ্রন্থে বেগম মুজিবকে নিয়ে মাঝেমাঝেই স্মৃতিচারণ করেছেন। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র সাত পৃষ্ঠায় বেগম মুজিবের আগমন একজন বধূ হিসেবে, যার নাম রেণু। বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ‘একটা ঘটনা লেখা দরকার, নিশ্চয়ই অনেকে আশ্চর্য হবেন। আমার যখন বিবাহ হয় তখন আমার বয়স বার বা তের বছর হতে পারে। রেণুর বাবা মারা যাবার পরে ওর দাদা আমার আব্বাকে ডেকে বললেন, ‘তোমার বড় ছেলের সাথে আমার এক নাতনীর বিবাহ দিতে হবে। কারণ,আমি সমস্ত সম্পত্তি ওদের দুই বোনকে লিখে দিয়ে যাব’। রেণুর দাদা আমার আব্বার চাচা। মুরব্বীর হুকুম মানার জন্যই রেণুর সাথে আমার বিবাহ রেজিষ্ট্রি করে ফেলা হলো। আমি শুনলাম আমার বিবাহ হয়েছে। তখন কিছুই বুঝতামনা,রেণুর বয়স তখন বোধ হয় তিনবছর হবে। রেণুর যখন পাঁচ বছর বয়স, তখন তার মা মারা যান। একমাত্র রইল তার দাদা। দাদাও রেণুর সাত বছর বয়সে মারা যান। তারপর সে আমার মা’র কাছে চলে আসে। আমার ভাইবোনদের সাথেই রেণু বড় হয়। রেণুর বড় বোনের ও আমার আর এক চাচাতো ভাইয়ের সাথে বিবাহ হয়। রেণু আমার শ্বশুরবাড়িতে থাকল, কারণ আমার ও রেণুর বাড়ির দরকার নেই। রেণুদের ঘর আমাদের ঘর পাশাপাশি ছিল, মধ্যে মাত্র দুই হাত ব্যবধান। অন্যান্য ঘটনা আমার জীবনের ঘটনার মধ্যেই পাওয়া যাবে।’ (অসমাপ্ত আত্মজীবনী:৭-৮)। এই হলো রেণু’র জীবন।

স্মৃতিকথায় আরও দেখা যায়, ‘রেণু কয়েকদিন আমাকে খুব সেবা করল। যদিও আমাদের বিবাহ হয়েছে ছোটবেলায়। ১৯৪২ সালে আমাদের ফুলশয্যা হয়’। (অসমাপ্ত আত্মজীবনী:২১)

বঙ্গবন্ধু যখন কলেজে ভর্তি হলেন, তখন থেকেই ফজিলাতুননেছা মানসিক সাহায্য প্রদান করেছেন। ‘আব্বা, মা, ভাইবোনদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে রেণুর ঘরে এলাম বিদায় নিতে। দেখি কিছু টাকা হাতে করে দাঁড়িয়ে আছে। ‘অমঙ্গল অশ্রুজল’ বোধহয় অনেক কষ্টে বন্ধ করে রেখেছে। বলল, “‍একবার কলকাতা দেখলে আর আসতে চাও না। এবার কলেজ ছুটি হলেই বাড়ি এস”।’ (অসমাপ্ত আত্মজীবনী: ৬১)। বঙ্গবন্ধু ইসলামিয়া কলেজে যখন পড়তে গেলেন। কলেজ প্রিন্সিপাল ডেকে বললেন,তুমি কলকাতা শহরে থাকতে পারবে না। অতঃপর তিনি শহরের বাইরে উল্টোডাঙ্গাতে তার বোনের বাড়িতে থাকলেন। বঙ্গবন্ধু যেন নিরবচ্ছিন্নভাবে লেখাপড়া করতে পারেন এজন্য তাকে উৎসাহ দেবার লক্ষ্যে তিনি উল্টোডাঙ্গা গিয়েছেন। এই স্মৃতিকথাটিতে তারই প্রমাণ পাওয়া যায়,‘কিছুদিন পর রেণুও কলকাতায় এসে হাজির। রেণুর ধারণা,পরীক্ষার সময় সে আমার কাছে থাকলে আমি নিশ্চয়ই পাস করব। বিএ পরীক্ষা দিয়ে পাস করলাম।’ (অসমাপ্ত আত্মজীবনী:৭২)। ‘টাকা পয়সা নাও থাকতে পারে। টাকার দরকার হলে লিখতে বলেছিল।’ (অসমাপ্ত আত্মজীবনী: ১১৮)।

নীরবে নিভৃতে বঙ্গবন্ধুর পাশে তিনি সৌভাগ্যের প্রতীক হয়ে ছিলেন। মাঝে মাঝে তাঁর অভিমানের বাঁধ ভেঙে যেতো। কিন্তু কিছুই প্রকাশ করতেন না। ‘রেণু বলল, “এভাবে তোমার কতকাল চলবে”। আমি বুঝতে পারলাম, যখন আমি ওর কাছে এলাম। রেণু আড়াল থেকে সব কথা শুনছিল। রেণু খুব কষ্ট করত,কিন্তু কিছুই বলত না। নিজে কষ্ট করে আমার জন্যে টাকা পয়সা জোগাড় করে রাখত যাতে আমার কষ্ট না হয়।’ (অসমাপ্ত আত্মজীবনী:১২৬)

‘লাহোর থেকে রেণুকে চিঠি দিয়েছিলাম,বোধ হয় পেয়ে থাকবে।’ ‘লাহোর থেকে ফিরে নিশ্চয়ই একবার বাড়িতে আসব। রেণু তো নিশ্চয়ই পথ চেয়ে বসে আছে। সে তো নীরবে সকল কষ্ট সহ্য করে, কিন্তু কিছু বলে না। কিছু বলে না বা বলতে চায় না, সেই জন্য আমার আরও বেশি ব্যথা লাগে।’ (অসমাপ্ত আত্মজীবনী: ১৪৫-১৪৬)। ‘গোপালগঞ্জ গিয়ে দেখি থানার ঘাটে আমাদের নৌকা। আব্বা, মা, রেণু, হাচিনা ও কামালকে নিয়ে হাজির। ঘাটেই দেখা হয়ে গেল।’ (অসমাপ্ত আত্মজীবনী: ১৮৩)

ধৈর্যশীল রেণু বাচ্চাগুলোকে নিয়ে একাই দিনাতিপাত করেছেন। অপেক্ষা করেছেন কখন বঙ্গবন্ধু কারাগার থেকে ফিরবেন। বঙ্গবন্ধুর প্রতি তাঁর ভালোবাসা ছিল শান্ত নদীর মতো বয়ে যাওয়া স্রোত, মাঝে মাঝে সেই স্রোত খরস্রোতা হয়ে যেতো। এই স্মৃতিকথাটুকু তাই প্রমাণ করে। ‘রেণু আমাকে যখন একাকী পেল, বলল, “জেলে থাকো আপত্তি নেই, তবে স্বাস্থ্যের দিকে নজর রেখ। তোমাকে দেখে আমার মন খুব খারাপ হয়ে গেছে। তোমার বোঝা উচিত আমার দুনিয়ায় কেউ নাই। ছোটবেলায় বাবা-মা মারা গেছেন, আমার কেউই নাই। তোমার কিছু হলে বাঁচব কি করে?” কেঁদেই ফেলল। আমি রেণুকে বোঝাতে চেষ্টা করলাম, তাতে ফল হয় উল্টা। আরও কাঁদতে শুরু করল।’ (অসমাপ্ত আত্মজীবনী: ১৯১)

রেণু মাঝে মাঝে রাগতস্বরে অভিমান নিয়ে কথা বলতেন। ‘কেন তুমি অনশন করতে গিয়েছিলে? এদের কি দয়া মায়া আছে? আমাদের কারও কথাও তোমার মনে ছিল না? কিছু একটা হলে কি উপায় হত? আমি এই দুইটা দুধের বাচ্চা নিয়ে কি করে বাঁচতাম? হাচিনা, কামালের অবস্থা কি হত? তুমি বলবা, খাওয়া-দাওয়ার কষ্ট তো হত না? মানুষ কি শুধু খাওয়া পরা নিয়েই বেঁচে থাকতে চায়? আর মরে গেলে দেশের কাজই বা কিভাবে করতা?” (অসমাপ্ত আত্মজীবনী: ২০৭)

কতটুকু দেশপ্রেমিক হলে এমন প্রশ্নবাণে জর্জরিত করতে পারেন বঙ্গবন্ধুকে। একসময় রেণু চিরচেনা গ্রাম ছেড়ে সন্তানদের নিয়ে ঢাকায় চলে আসেন। ভাড়া থাকেন ঢাকার বিভিন্ন স্থানে। এই স্মৃতিকথা থেকে তাই জানা যায়, ‘রেণু ঢাকায় এসেও শান্তিতে বাস করতে পারেননি। আমি সন্ধ্যার দিকে ঢাকায় ফিরে এলাম। বাসায় যেয়ে দেখি রেণু ছেলেমেয়ে নিয়ে গতকাল ঢাকায় এসেছে। সে এখন ঢাকায়ই থাকবে’ (অসমাপ্ত আত্মজীবনী: ২৬২)। ‘আমার স্ত্রীও তখন নতুন ঢাকায় এসেছে। বাংলাদেশ ভাগ হওয়ার পূর্বে যদিও কলিকাতা গিয়াছে, কয়েকবার আমাকে দেখতে, কিন্তু ঢাকায় সে একবারে নতুন; সকলকে ভাল করে জানেও না। মহাবিপদে পড়লো। সরকার হুকুম দিয়েছে ১৪ দিনের মধ্যে বাড়ি ছাড়তে। ছোট ছোট ছেলেমেয়ে নিয়ে মহাবিপদেই পড়ল আমার স্ত্রী।’ (কারাগারের রোজনামচা:১১৯-১২০)

তাও হাল ছেড়ে দেননি রেণু। একসময় রেণু বড় মেয়ের বিয়ের জন্য ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়েন। ‘রেণু দেখা করতে এসেছিল। রেহানার জ্বর,সে আসে নাই। রাসেল জ্বর নিয়ে এসেছিল। হাচিনার বিবাহের প্রস্তাব এসছে। রেণু ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।’ (কারাগারের রোজনামচা: ১৯৪)। ‘১৪ তারিখে রেণু বিশেষ অনুমতি নিয়ে দেখা করতে এসেছে। ঈদের জন্য এই অনুমতি দিয়েছে।’ (কারাগারের রোজনামচা:২০৩)।

কারাগারে বঙ্গবন্ধুর জন্য নিয়মিত খাবার পাঠাতেন রেণু। ‘যথারীতি রবিবার সকাল থেকে খিচুড়ি পাকের জোগাড়ে আত্মনিয়োগ করা হলো। রেণু কিছু ডিমও পাঠাইয়াছে।’ (কারাগারের রোজনামচা:২৩৫)।

বঙ্গবন্ধুর ‘রেণু’ একজন রাজনৈতিক প্রজ্ঞাসম্পন্ন দূরদর্শী নারী ছিলেন বলেই তাঁর স্মৃতিকথা লেখার জন্য খাতা তুলে দিতেন। নইলে কালের গর্ভে হারিয়ে যেতো কত অজানা ইতিহাস। এই স্মৃতিকথাটি তারই উদাহরণ, ‘আমার সহধর্মিণী একদিন জেলগেটে বসে বলল, ‘বসেই তো আছো,লেখ তোমার জীবনের কাহিনী’ (অসমাপ্ত আত্মজীবনী:২)। কারাগারের রোজনামচা’র উপক্রমণিকায় বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা লিখেন, ‘আমার মা আমাকে বললেন, ‘একবার যেতে পারলে আর কিছু না হোক তোর আব্বার লেখা খাতাগুলো যেভাবে পারিস নিয়ে আসিস।’ খাতাগুলো মার ঘরে কোথায় রাখা আছে তাও বলে দিলেন। আব্বার লেখা এই খাতা উদ্ধার আমার মায়ের প্রেরণা ও অনুরোধের ফসল। আমার আব্বা যতবার জেলে যেতেন মা খাতা, কলম দিতেন লেখার জন্য। বারবার তাগাদা দিতেন। আমার আব্বা যখন জেল থেকে মুক্তি পেতেন মা সোজা জেল গেটে যেতেন, আব্বাকে আনতে আর আব্বার লেখাগুলো যেন আসে তা নিশ্চিত করতেন। সেগুলি অতি যত্নে সংরক্ষণ করতেন’। (কারাগারের রোজনামচা: ৮-৯)

বঙ্গমাতা তিনি যেমন অতিথিবৎসল ছিলেন, ছিলেন পশুপ্রেমী। বরেণ্য লেখক ও অধ্যাপক ড. নীলিমা ইব্রাহীম বেগম ফজিলাতুননেছা মুজিবের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে এক পর্যায়ে লেখেন, ‘রেণুর আরেকটি পোষ্য ছিল একটি খাঁটি বঙ্গ সন্তান অর্থাৎ দেশী কুকুর নাম তার টমি। ২৫ মার্চে টমি বত্রিশ নম্বরেই ছিল। তারপর কেমন করে কেউ জানে না ১৮ নম্বর বাড়িতে এসে হাজির। টমি থাবা দিয়ে গেটে ধাক্কা দিতো,সেন্ট্রি দরজা খুলে দিতো। রেণু খুব উপভোগ করত এ দৃশ্য—বলতো, ‘তোরা আমাকে দরজা খুলে না দিলেও, রোজ দু’বেলা আমার কুকুরকে তো গেট খুলে দিস।’ এতেই বুঝা যায়, তিনি কতটা সংবেদনশীল নারী ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর ব্যবহৃত পাইপে তামাক পুরে দেওয়া থেকে শুরু করে,পায়জামার ডুরি পর্যন্ত লাগিয়ে দিতেন তিনি। রাজনৈতিক কর্মীদের আপ্যায়নের জন্য তাঁর সংগ্রহে ছিল শ’পাঁচেক কাঁচের প্লেট, কাপ। যা পরবর্তীতে ১৯৭১ এ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। বিলাসবহুল আসবাবপত্র ছিল না। অত্যন্ত সাধারণ জীবন যাপনে অভ্যস্ত বঙ্গমাতা অধ্যাপক ড. নীলিমা ইব্রাহীমের সাথে কথোপকথনের এক পর্যায়ে বলেছিলেন, ‘একদিন খুব গম্ভীরমুখে রেণু বলল—‘আপা,আমি আপনাদের উপর খুব রাগ করেছি। শান্ত হয়ে বললাম, ‘বেশ? কি করছি আমরা?’ বললেন নিজের ভাইকে বানিয়েছেন বঙ্গবন্ধু আর আমাকে বঙ্গমাতা, বেশ আমি বুঝি ‘বঙ্গবান্ধবী’ হতে পারি না? এতোই কি বুড়ো হয়েছি’। আমরা সবাই হেসেই অস্থির।’ এই হলো বঙ্গমাতার সহজ সরল কথোপকথন।

বেগম মুজিবের ছোট কন্যা শেখ রেহানা বলেন, ‘আমার মায়ের কাছ থেকে আমাদের যে জিনিসটি সবার আগে শেখা উচিত, তা হলো ধৈর্য আর সাহস’। বেগম মুজিব দশগুণে গুণান্বিতা যেন দশভুজ নারী,তাঁর মধ্যে যে দশটি গুণ দেখা যায়, তা হলো, তিনি একাধারে আদর্শ মাতা, বুদ্ধিমতী স্ত্রী, ধৈর্যশীল, বিচক্ষণ, ব্যক্তিত্বসম্পন্ন, ধীশক্তি সম্পন্ন, রাঁধুনী, দূরদর্শী এবং সাহসী নারী। বেগম মুজিবের মাঝে নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়ার প্রতিচ্ছবি দেখতে পাওয়া যায়। বেগম রোকেয়া স্বপ্ন দেখেছিলেন বৈষম্যমুক্ত সমাজের। বেগম মুজিব স্বপ্ন দেখেছিলেন বৈষম্যমুক্ত রাষ্ট্রের। তিনি ‘বঙ্গমাতা’ হয়ে বেঁচে থাকবেন ইতিহাসের পাতায়। এমন একজন মহীয়সী নারী ঘাতকের গুলিতে ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট প্রাণ হারান। বনানী গোরস্তানে বঙ্গবন্ধুর রেণু বাঙালির বঙ্গমাতা বেগম মুজিব বুকের সব কষ্ট চাপা দিয়ে নীরবে শায়িত আছেন।

কবি মু. জালাল উদ্দিন নলুয়া। বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুননেছা মুজিবের ৯০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে ‘বঙ্গমাতা’ স্মরণে তাঁর কবিতা দিয়ে লেখাটি শেষ করব।

‘পুতুল খেলার বয়সে হলে তুমি ঘরনী

তোমাকে ধন্য ধন্য করে আজ এই ধরনী।
শান্তির ঘরে কারাগার দেখেছো বারবার
দিশারী অগ্নিতেজে দুর্বার রাহবার।
অমানিশার কালিমা নাশি সত্যের খোঁজে
শোষকের পতন চাহি মুক্ত ভাষা বুঝে।
সংগ্রামী মহা সারথীর দুর্জয়ে অগ্নিশপথে
সাহস যোগাও সতত ছোট আলোর রথে।
কত ঈদ, কত পার্বণ কত না শুভদিন
মুক্তি কামনায় সারথী কারাগারে অন্তরীণ।
ঘরের চেয়ে মাতৃভূমি প্রিয়, অনেক বড়ো
বঞ্চিত জনতার কান্না হৃদয়ে আছে জড়ো।
শিকল ভাঙ্গার গানে দিশারী অহরহ জাগে
ফুল ফোটায় ঘরনী তাঁর সংসার বাগে।
ডানা মেলে মুক্ত বলাকা
রক্তে ভিজে পতাকা
অম্লান তুমি বঙ্গমাতা
আছো হৃদয়ে আঁকা।
শুভ জন্মদিন শ্রদ্ধেয় ‘বঙ্গমাতা’।

লেখক: – ড. জেবউননেছা
সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান,
লোকপ্রশাসন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
এবং শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক,
বঙ্গবন্ধু শিক্ষা ও গবেষণা বিষয়ক পরিষদ

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..

 

Copyright © All rights reserved © 2019 Kansatnews24.com
Theme Developed BY Sobuj Ali
error: Content is protected !!