শনিবার, ০১ অগাস্ট ২০২০, ০৫:৩২ পূর্বাহ্ন

আওয়ামী লীগের ৭১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী : প্রসঙ্গ নারায়ণগঞ্জ

ড. জেবউননেছা
  • আপডেট টাইম মঙ্গলবার, ২৩ জুন, ২০২০
  • ৯০ বার পঠিত

সকাল থেকে ভাবছি, প্রাচীনতম রাজনৈতিক সংগঠন ‘বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের’ ৭১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষির্কী নিয়ে কিছু লিখব। লেখার শুরুতে মুঠোফোনে ফোন দিলেন নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা ইউনিয়নের কমান্ডার আমাদের মহল্লার বীর মুক্তিযোদ্ধা তমিজউদ্দিন। ফোন দিয়ে বললেন, মা, আজ আওয়ামী লীগের ৭১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। আমি বললাম, জি কাকা আমি জানি। ৭১’ শব্দটি একজন মুক্তিযোদ্ধার কাছ থেকে শুনে আমি অন্যরকম বোধ অনুভব করলাম। কাকার সাথে কথা বলার পর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নিয়ে লিখতে আরও বেশি তাগিদ অনুভব করলাম।

একাত্তর শব্দটির সাথে জড়িয়ে আছে মানে মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা, লাল সবুজ পতাকা। এই প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশ আজ ৭১ বছর পূর্বে গড়ে ওঠা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের হাত ধরেই। যে দলের কর্ণধার বছরের পর বছর কারাবরণ করেছেন একটি শোষণমুক্ত সমাজের জন্য। হ্যাঁ, তিনি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, স্বাধীনতার স্বপ্নদ্রষ্টা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এ বছর তাকে স্মরণ করেই পালিত হচ্ছে মুজিববর্ষ। কাকতালীয়ভাবে মিলে গেছে এ বছরই বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ৭১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী।

প্রাচীন এই দলটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল নারায়ণগঞ্জে। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ৭১ বছর পূর্বে নারায়ণগঞ্জের চাষাড়ায় খান সাহেব ওসমান আলীর বাসা ‘বায়তুল আমানেই’ হয়েছে আওয়ামী লীগের প্রথম বৈঠক। পরবর্তীকালে, নারায়ণগঞ্জের পাইকপাড়া মিউচুয়াল ক্লাবে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের জন্ম হয়েছিল। ‘আমরা পাইকপাড়া ক্লাবে সভা করলাম। বিভিন্ন জেলার অনেক নেতাকর্মী উপস্থিত হয়েছিলেন। এই সময় শামসুজ্জোহার উপর মুসলিম লীগের ভাড়াটিয়া গুন্ডারা আক্রমণ করেছিল (অসমাপ্ত আত্মজীবনী:১০১)’।

১৬ মে, ১৯৪৮ তারিখে পাইকপাড়ার মিউচুয়াল ক্লাবে বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সাবেক কাউন্সিলরদের একটি রুদ্ধদ্বার সভা অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী বক্তৃতা শুরু করেন। বৈঠকে শেখ মুজিবুর রহমানও অন্যান্য নেতৃবৃন্দ এই সভায় সংক্ষিপ্ত বক্তৃতা রাখেন। ১৭ মে, ১৯৪৮ তারিখে বিকেল ৫টায় নারায়ণগঞ্জের পাবলিক লাইব্রেরিতে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। যে সভায় উপস্থিত ছিলেন মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, খান সাহেব ওসমান আলী এমএলএসহ নারায়ণগঞ্জের নেতৃবৃন্দ।

১৭ মে, ১৯৪৮ তারিখের সভায় যারা বক্তব্য প্রদান করেছিলেন তাদের নাম ২৯.০৫.১৯৪৮ ইং তারিখের গোয়েন্দা রিপোর্ট দেখা যায় (Secret Documents of Intelligence Branch on Father of the Nation Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman,Vol-1 1948-1950: 16 Ges 23). ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন বিকেলে ঢাকার কেএম দাস লেনের রোজ গার্ডেনে ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের’ অভিষেক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। পরবর্তীকালে সেই দলের পরিবর্তিত নাম হয় ‘বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ’

আন্দোলন সংগ্রামে গর্জে ওঠা নারায়ণগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক সচেতন গ্রাম নলুয়া এলাকায় আমার জন্ম। নারায়ণগঞ্জের যে বাড়িতে আমার জন্ম হয়েছিল তার ঠিক পাশের জায়গাতে ১৯৪৮ সাল থেকে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের কার্যালয় ছিল। পরবতীকালে, পূর্বের কার্যালয়ের ঠিক পাশে নতুন আর একটি স্থানে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কার্যালয় ১৯৫৪ সনে উদ্বোধন করেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং আবুল মনসুর আহমেদসহ নারায়ণগঞ্জের নেতৃবৃন্দ।

১৯৬৬ সালের ছয়দফা সংগ্রামের প্রচারের গোপন সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল আমাদের বাসা থেকে দুই মিনিটের ব্যবধানে অবস্থিত নারায়ণগঞ্জের নিতাইগঞ্জের বি.কে রোডস্থ মহিউদ্দিন আহমেদের (খোকা) বোনের বর শফিউদ্দিন আহমেদ শরীফ মুন্সী সাহেবের বাসায়। উক্ত সভায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তাজউদ্দীন আহমদ, মিজানুর রহমান চৌধুরী (পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য), আলী আহমেদ চুনকা, এ কে এম শামসুজ্জোহাসহ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন (১২.০১.২০০১ইং তারিখে বীর মুক্তিযোদ্ধা তমিজউদ্দিন কাকার সাক্ষাৎকার থেকে)।

আমার নানাবাড়ি নারায়ণগঞ্জ জেলার বন্দর থানার মদনগঞ্জে। নানাবাড়িতে টাঙ্গিয়ে রাখা জাতির জনকের বড় ছবি শৈশব থেকে দেখেছি। আমার নানা সাহাবুদ্দিন চৌধুরী (সাহা মেম্বার) তৎকালীন নারায়ণগঞ্জের মদনগঞ্জের বন্দর থানা স্থানীয় আওয়ামী লীগের আমৃত্যু সদস্য ছিলেন। বাবা ২৪.৭.১৯৬৫ ইং তারিখে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের সদস্যপদ লাভ করেন। তখন চাঁদার হার ছিল ১২ পয়সা। আমার জেঠা প্রয়াত সালাহউদ্দিন আহমেদ (আব্বুর বড় ভাই) ও পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের একজন নিবন্ধিত সদস্য ছিলেন। শৈশব থেকে দেখেছি বাবা ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ করেই বলতেন ‘নৌকা’ প্রতীকে ভোট দেবেন। আজীবন তাই করেছেন।

আওয়ামী আদর্শের পরিবার হিসেবে কোনোদিন মাথানত করিনি বলে ব্যক্তিজীবনে ক্যারিয়ারের শুরুতে এবং পরবর্তীতে শিক্ষাক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। তবুও নুইয়ে যাইনি। বঙ্গবন্ধু রচিত ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ এবং ‘কারাগারের রোজনামচা’ গ্রন্থে বঙ্গবন্ধু লিপিবদ্ধ করেছেন নারায়ণগঞ্জের নেতৃবৃন্দের কথা। অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে লিখেছেন ‘নারায়ণগঞ্জের কর্মীদের ত্যাগ ও তিতিক্ষার কথা কোনো রাজনৈতিক কর্মী ভুলতে পারে না (পৃ:২০০)’। ১৯৪৮ থেকে ১৯৭১ এ সময়ে নারায়ণগঞ্জ মাথানত করেনি কোনো অন্যায়ের কাছে। নারায়ণগঞ্জ মানেই বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের জ্বলজ্বলে ইতিহাস। অনাগতকাল ধরে যতদিন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ইতিহাস থাকবে, ততদিন নারায়ণগঞ্জের নেতাকর্মীবৃন্দের কথা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবেন নারায়ণগঞ্জবাসী।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ৭১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি প্রাচীন এই দলটির নেতৃবুন্দদের, যারা দুঃসময়ে হাল ধরেছেন। দলটির পাশে থেকেছেন। বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ এ ডেভিড ফ্রস্টের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘নেতৃত্ব আসে সংগ্রামের প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। কেউ আকস্মিকভাবে একদিনে নেতা হতে পারে না। ’বঙ্গবন্ধুর এই বক্তব্যটি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনার জীবনের সাথে মিলে গেছে। যিনি বহু সংগ্রাম প্রতিকূলতা পেরিয়ে আজ আমাদের নিকট একজন মমতাময়ী এবং দায়িত্বশীল নেতা। ঐতিহ্যবাহী প্রাচীনতম রাজনৈতিক সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে তাকে জানাই শুভেচ্ছা এবং সালাম।

লেখক : ড. জেবউননেছা
সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান,
লোক প্রশাসন বিভাগ,
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এবং
শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক বঙ্গবন্ধু শিক্ষা এবং গবেষণা পরিষদ।

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
Copyright © All rights reserved © 2019 Kansatnews24.com
Theme Developed BY Sobuj Ali
error: Content is protected !!