বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২০, ০৯:৪৬ অপরাহ্ন

সোনার গাঁ-ঢাকা- কর্ণসুবর্ন : প্রসঙ্গ চাঁপাইনবাগঞ্জ

ড. জেবউননেছা
  • আপডেট টাইম রবিবার, ৩১ মে, ২০২০
  • ১৬১ বার পঠিত

সাত (৭) সংখ্যা আমার জন্য বরারবরই একটি সৌভাগ্যের প্রতীক। ৭ এপ্রিল আমার জন্ম। ৭ এপ্রিল ২০১০ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটে আমার চাকুরী হয়। ৭ আমার বাসার ফ্ল্যাট নম্বর। আর এই ৭ সংখ্যায় গৌড়ের রাজধানী কর্ণসুবর্ণ এবং আমের রাজধানী চাঁপাইনবাবগঞ্জের সন্তান মোঃ মবিন উদ্দিনের সাথে বন্ধন তৈরীর সূত্রপাত হয়। অর্থাৎ ০৭ মার্চ,২০০৪ সনে বড় ননাস,যাকে আমি বড়দিদি বলি এডভোকেট আনজুমান আরা,যিনি চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা জজ কোর্টের পাবলিক প্রসিকিউটর, জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি এবং মেজো ভাসুর গাজীপুর জেলা জজকোর্টের এডভোকেট মোঃ জামাল উদ্দিন ভাই আমাদের নারায়ণগঞ্জের বাড়ীতে এসে আমাকে আংটি পরিয়ে দেন। লেখাটি যখন লিখছি তা ও সাত সংখ্যাকেই ঘিরে। কানসাট নিউজ২৪.কম’র সপ্তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষ্যে। লেখার শুরুতে পত্রিকাটির সফলতা কামনা করি। প্রকাশক ও সম্পাদক মোহাঃ ইমরান আলী ভাই কানসাট নিউজ২৪.কম নিয়ে লেখা চাইলেন। আমি বললাম, আমার শশুড়বাড়ী এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ মিলিয়ে লিখতে চাই। তিনি বললেন, লিখেন।

লিখতে গিয়ে ভর করছে নানা রকমের স্মৃতি। প্রথমে যার সাথে গাটছড়া বেঁধেছি মোঃ মবিন উদ্দিন কে নিয়েই লিখি। চাঁপাইনবাবগঞ্জের মহানন্দার তীরে হাসপাতাল রোডের বাড়ীতে তার জন্ম হয়েছিল। চাঁপাইনবাবগঞ্জ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণী এবং ষষ্ঠ শ্রেণীতে হরিমোহন সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ে সে লেখাপড়া করেছে। পরবর্তীতে, নটরডেম কলেজে অধ্যয়ন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লেখাপড়া করে। অতঃপর সেন্ট্রাল কলেজ থেকে এলএলবি করেন। বর্তমানে সে ব্যবসায় নিজেকে নিয়োজিত করেছে। আমার মায়ের মতে,আমার চেয়ে মবিন বেশী ভালো। আর আমার মতে, এরকম শক্তিশালী চরিত্রের পুরুষ আমি দ্বিতীয়টি দেখিনি। একজন সৎ ব্যবসায়ী এবং ধার্মিক মানুষ তিনি। তবে জীবনের শুরুতে ঘাত প্রতিঘাতে কেটেছে তার জীবন। নয় বছর বয়সেই আমার শাশুড়ী (আম্মা) চলে যান পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে। আটভাই বোনের ,মধ্যে কনিষ্ঠ সন্তান সে। আমার ভাসুর পাঁচ জন। যাদের আমি ভাইয়া বলে সম্বোধন করি। এর মধ্যে বড় ভাসুর এডভোকেট হেলাল উদ্দিন ভাই, আশি দশকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি ছিলেন। পরবর্তীতে, স্বৈরাচারী এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের জাতীয় চারজন ছাত্র নেতার মধ্যে অন্যতম নেতা ছিলেন। তিন ভাসুর ব্যবসা বাণিজ্য করেন। মেজো ভাসুরের কথা লেখার শুরুতেই উল্লেখ করেছি।

প্রাচ্যের ড্যান্ডি শ্রেষ্ঠ নদীবন্দর নারায়ণগঞ্জে আমার জন্ম। দাদাবাড়ী এবং নানাবাড়ী সব আত্মীয় স্বজন নারায়ণগঞ্জে। নারায়ণগঞ্জের রিদম কমিউনিটি সেন্টারে এক জাকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানে ১৪ মে,২০০৪ ইং তারিখে এক পড়ন্ত বিকেলে আমার বাবা মা আমাকে তুলে দেন আমার শশুড় (আব্বা) আলহাজ্ব অধ্যাপক মুহাঃ জারজেস হোসেন, যিনি চাঁপাইনবাবগঞ্জ সরকারী মহিলা কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ এবং আমার বড় দিদির স্বামী এডভোকেট নজরুল ইসলাম ভাই এবং আমার ভাসুরদের হাতে। নজরুল ইসলাম দুলাভাই তেভাগা আন্দোলনের একজন সক্রিয় কর্মী ছিলেন। পরবর্তীতে ১৯৬৯ সনের গণ আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। তিনি বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ডের পর তাকে গ্রেফতার করা হয়। আড়াই বছর তিনি কারাবাস করেন আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত,সৈয়দ রেজাউর রহমান,আব্দুল জলিল এবং আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতৃবৃন্দের সাথে। পরবর্তীতে, তিনি একাধিকবার চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি এবং সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।

যাই হউক ১১.১১.২০০৪ইং তারিখে চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রথম যাই। জন্মের পর এত দূর কোন জায়গায় যাওয়া সেটিই ছিল প্রথম অভিজ্ঞতা। ঢাকা থেকে রওয়ানা দিয়ে যখন গাড়ী রাজশাহীর পুঠিয়া অতিক্রম করছে,তখন বারে বারে মবিনকে জিজ্ঞেস করছিলাম,আর কত দূর? আর কত দূর ? মনে হচ্ছিল,এর ভিতরে আর ও দূরে ও কোন শহর আছে? যখন চাঁপাই পৌঁছলাম। অবাক হয়ে গেলাম এত দূরে ও এত সুন্দর সমৃদ্ধ শহর । মনে হচ্ছিল, আমি আমার প্রাচীন নগরী নারায়ণগঞ্জেই আছি। সেইবার যখন প্রথম গিয়েছি তখন ছিল বিয়ের পর প্রথম ঈদ। শশুড়বাড়ীর সবাই এত উপহার আর ভালোবাসা দিয়েছেন তা ভুলে যাবার মত নয়। তখনই পরিচয় হয়েছিলাম কালাইর রুটির সাথে। আর নবাব মিষ্টান্ন ভান্ডারের প্যারা মিষ্টি আগেই বিয়েতে দেখেছি। আব্বা নিয়ে গিয়েছিলেন।

আমার শাশুড়ী (আম্মা) দেলখোশ বেগম কানসাটের চককীর্তি ইউনিয়নের মোড়লটলা গ্রামের সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ে। তাকে আমি দেখিনি। সবার মুখে আম্মার গল্প শুনেছি। তিনি ভীষন মিশুক মানুষ ছিলেন। একটি স্মৃতি না উল্লেখ করলেই নয়। একদিন মহানন্দা তীরে দাঁড়িয়ে আছি। একজন সিঁদুর পরা মহিলা জানতে চাইল আমি কে? নদীর পাড়ে শশুড়বাড়ী দেখিয়ে বললাম,এ বাড়ীর ছোট ছেলের স্ত্রী আমি। তিনি আমাকে বলেন,তোমার শাশুড়ী খুব ভালো মানুষ ছিলেন। আমরা স্নান করে ফেরার সময় তোমার শাশুড়ীর অনুমতিতে তোমাদের বাড়ীতেই ভিজে কাপড় পরিবর্তন করতাম। আমি বিস্মিত হয়ে গেলাম। তখন সনটা ২০০৫ আর আমার শাশুড়ী চলে গিয়েছেন ১৯৯১ তে। ১৬ বছর ধরে তিনি স্মৃতিটাকে আঁকড়ে রেখেছেন। এখন সেই বাড়ীটির পাশে ছোট দিদি বাস করেন। ছোট দিদি (ননাস) ফিরোজা বেগম জনতা ব্যাংক চাঁপাইনবাবগঞ্জ শাখার কর্মকর্তা এবং তার স্বামী চাঁপাইনবাবগঞ্জের জেলা জজকোর্টের এডভোকেট এবিএম সাইদুল ইসলাম ১৯৭১ এ অসহযোগ আন্দোলনে স্থানীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ পালন করেন। সাইদুল ভাই একাধারে একযুগ চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার বাংলাদেশের কমিউনিষ্ট পার্টির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ছোট দিদির বড় মেয়েটি এখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বিভাগে শিক্ষকতা করছে। দুই মেয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে।

যাই হউক, হাসপাতাল রোডের যে বাড়ীতে আমার শশুড়বাড়ীর সবাই বাস করতেন । সেই বাড়ীটি নিয়ে এবং আমার শাশুড়ীকে নিয়ে একটি কবিতা লিখলাম,যেটি পরবর্তীতে আমার কাব্যগ্রন্থ ‘রোদেলা দুপুর’ এ প্রকাশিত হয়। মহানন্দা নদীর ধারে ছিল একটি বাড়ী/সে বাড়ীতে ছিল শান্ত এক নারী/হাসি খুশি ভরা সংসার ছিল তার,/সন্তানেরা দূর করে ছিল সকল অন্ধকার/মরনব্যাধি করাল গ্রাস নিল তাকে কেড়ে/সংসারের সুখ উড়ে গেল সে নারীর বুক চিরে/সেই বাড়িটি আছে, নাই সে শান্ত নারী/সে বাড়ীতে অন্য নারী উড়ায় রঙিন ঘুড়ি/হায়! শান্ত নারী চলে গেল বাঁধন ছিড়ে/স্মৃতিগুলি রয়েছে তোমার চারপাশ ঘিরে/তোমার কথা এখনও সবার মুখে মুখে/দোয়া করি জান্নাতে থাকো চির সুখে।

৭০ দশক থেকে হাসপাতাল রোডের তিনতলা বাড়ীটিতে আব্বা স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। আব্বা আমাকে কখনো আমার নাম ধরে ডাকতেননা। তিনি আমাকে ‘মা’ বলতেন। মনে পড়ে আমি যখন চাঁপাই যেতাম। যতক্ষণ পর্যন্ত না যেতাম ততক্ষণ তিনি আমাকে ফোন দিতেন। কোথায় আছি জানতে চাইতেন। পথের মাঝে অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকতেন। একবার আমি আর আব্বা কানসাট থেকে রিকশায় চককীর্তি মোড়লটলা গ্রামে গিয়েছিলাম। যেতে যেতে আমাদের আম বাগান তিনি দেখিয়েছেন। কতশত স্মৃতি আব্বার সাথে। ঈদুল আযহায় কোরবানীর মাংস কুরিয়ারে ঢাকা পাঠিয়েছেন। আম পাঠিয়েছেন। তিনি আমাকে ভীষণ ভালোবাসতেন। একবার আব্বা ২১.১২.২০০৪ ইং তারিখে মবিনকে দেয়া লিখিত চিঠিতে এক পর্যায়ে লিখেন, ‘জেবার মত বুদ্ধিমতী মেয়ে তোমাকে সবকিছুতেই সাহায্য করতে পারে বলে আমি মনে করি’। একজন শশুড়ের কাছ থেকে এমন মূল্যায়ন পাওয়া নিশ্চই সৌভাগ্যের ব্যাপার। আব্বা সবসময় বলতেন আমার বড় ছেলের স্ত্রী ডাক্তার। ছোট ছেলে স্ত্রী ড.। আমার বড় জা অধ্যাপক ড. নূরজাহান বেগম তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ^বিদ্যালয়ে মানুষের সেবা করে এখন অবসরে আছেন। তিনি চাঁপাইর মেয়ে। ২০০৬ সনে ১০ সেপ্টেম্বর পিজি হাসপাতালে আসিরের জন্ম হয়। আসিরের জন্মের সময় আমার মাথার কাছে আমার বড় জা ছিলেন। অপারেশন করেছেন অধ্যাপক ড. ফিরোজা বেগম। বড় জা এর মেয়ে একজন স্থপতি। দুঃখজনক হলে ও সত্যি আব্বা আমাকে পিএইচডি ডিগ্রী অর্জন করতে দেখে যাননি। আব্বাকে নিয়ে লিখে শেষ করা যাবেনা। আব্বু আব্বাকে ভীষণ পছন্দ করেন এবং সম্মান করেন। আব্বু ভীষণ খুশী এমন একজন মানুষকে তিনি বিয়াই হিসেবে পেয়েছেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জে আব্বু আর আব্বা ঘুরে বেরিয়েছেন। আব্বুকে নিয়ে আব্বার কলেজে গিয়েছেন। আসিরের জন্মের পর আমি ফোন করে জানাই আব্বা আপনার নাতির নাম রাখবেন। আব্বা শর্ত দেন, ২১ দিনের মাথায় আকিকা দিতে হবে। আমরা সেই শর্ত পালন করলাম। আব্বা নাম রাখলেন ‘আসির আনজার’ যার নামের অর্থ ‘সম্মানিত সতর্ক’। পরবর্তীতে আব্বা আসিরকে নিয়ে কবিতা লিখেন,‘দাদুভাই তোমার নাম রাখলাম আসির/ধন্য যেন হও কাছে জগতবাসীর’। এরপর আব্বু লিখেন আসিরকে নিয়ে লিমেরিক-‘আদরের আসির আনজার /লক্ষ্যা মহানন্দায় গান যার/দাদা দাদীর কোলে/নানা নানীর বোলে/কদম রসুল -সোনা মসজিদ মান যার’। শতাধিক গ্রন্থের লেখক কবি অধ্যাপক ড. শহীদুল্লাহ আনসারী সহ আর ও অনেকে আসিরকে নিয়ে কবিতা লিখেছেন। আসিরের জন্মের পর আমি সিদ্ধান্ত নিলাম চাঁপাই যাব। আসিরকে দেখাব। কিন্ত আসিরের বাবা রাজী হলোনা। আমি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলাম। আসিরের জন্মের ৪২ দিনের সময় ২.১১.২০০৬ইং তারিখে আব্বুকে নিয়ে চলে গিয়েছিলাম। আমার কাছে মনে হয়েছে,আসিরের সাথে আব্বার স্মৃতি থাকুক। এখনো সেই ছবিগুলো স্মৃতি হয়ে গিয়েছে। আব্বা ভীষণ খুশী হয়েছিলেন। মনে পড়ে,আসির চাঁপাই যে কয়দিন ছিল সেই কয়দিন ভীষণ কান্না করেছিল। আমার মা তার সুস্থতার জন্য ৫০ রাকাত নফল নামাজ মানত করেছিলেন। আব্বা আমাদের সবাইকে ছেড়ে ২৪ নভেম্বর ২০১০ইং তারিখে চলে যান। আব্বার চলে যাওয়ার খবর শুনে আব্বু, আমি মবিন আমরা ছুটে যাই চাঁপাইনবাবগঞ্জ। সারারাস্তা কাঁদতে কাঁদতে চোখের পানি শুকিয়ে যাবার মতো অবস্থা হয়েছিল। কেউ থামাতে পারেনি আমার আর্তচিৎকার। এলাকার মানুষ অবাক হয়েছে পুত্রবধূ শশুড়ের জন্য এতটা অন্তপ্রাণ হতে পারে এই ভেবে। কতবছর যে লুকিয়ে লুকিয়ে আব্বার জন্য কেদেঁছি তার হিসেব দিতে পারবনা। এরপর দীর্ঘ দশ বছর আর যাওয়া হয়নি।

১০ বছর পর গত ডিসেম্বর ২০১৯ সানে চাঁপাই যাই। এবার চাঁপাই গিয়ে ঘুরেছি ভীষণ। শিবগঞ্জের কানসাট রাজা বাড়ী। এই রাজা বাড়ী সম্পর্কে আমি পূর্বেই শুনেছি আমার শশুড়বাড়ী থেকে। এই কানসাট জমিদারবাড়ী পরিদর্শন করতে গিয়ে মনটা খারাপ হয়ে গেল। জমিদারবাড়ী প্রধান ফটক দেয়াল বন্ধ করা হয়ে আছে। জমিদারবাড়ীর আশেপাশের সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বাড়ীটির ছাদ ও দেয়াল ভেঙ্গে পড়ার আশংকা রয়েছে। ওমরপুরের সন্নিকটে অবস্থিত বাংলার প্রথম যুগের মুসলিম স্থাপত্য কীর্তির একটি উল্লেখযোগ্য নিদর্শন দারাস মসজিদের কোন ছাদ নেই। মসজিদটি ১৪৭৯ খ্রিষ্টাব্দে মুলতান শাশসউদ্দিন ইউসুফ শাহের রাজত্বকালে মসজিদটি স্থাপিত হয়। দারাস বাড়ী মাদ্রাসা থেকে মন খারাপ করে বের হয়ে কিছুটা পথ পেরিয়ে গেলাম খানিয়াদীঘি মসজিদ। আনুমানিক ১৫শ শতকে নির্মিত হয়েছিল, যা গৌড়ের প্রাচীন কীর্তিগুলোর মধ্যে অন্যতম। ১৪৮০ খ্রিষ্টাব্দের কোন এক রাজবিবি মসজিদটির নির্মাণ করেন। এই মসজিদটি ১৫শ শতকের শেষের দিকে পরবর্তী সুলতান শামসউদ্দিন ইলিয়াসের আমলে নির্মিত হয়েছিল। শহীদ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের সমাধি, সোনামসজিদ স্থল বন্দর,জিরো পয়েন্ট। দূর থেকে দেখলাম দখল দরওয়াজা।

এতদসত্বেও আমাকে তাড়িয়ে বেরিয়েছে আব্বার সাথে স্মৃতিগুলো। আব্বার প্রতিষ্ঠাকৃত কলেজ নবাবগঞ্জ সরকারী কলেজের অনার বোর্ডে আব্বার নামটি এখনো অক্ষত রয়েছে । এই কলেজে এখন শিক্ষকতা করছেন আমার বড় ননাসের (বড় দিদি) এর মেয়ে জোবাইদা নাজনীন ইলা। ইলা আমাদের শশুড়বাড়ীর পরিবারের আদরের বড় নাতনি। চাঁপাইনবাবগঞ্জের প্রাক্তন এমএনএ বীর মুক্তিযোদ্ধা এইচ এম রইসউদ্দিনের নাতির সাথে ইলার বিবাহ হয়েছে। ইলার চাচা শশুড় আন্তজার্তিক অপরাধ ট্রাইবুন্যালের প্রধান কৌশুলী একুশে পদক প্রাপ্ত ভাষা আন্দোলন সংগঠক,মুক্তিযোদ্ধা গোলাম আরিফ টিপু। ইলার আর ও দুই বোনের একজন বাংলাদেশ ব্যাংকের উপ পরিচালক আর একজন রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের কর্মকর্তা । আমার দুই ননাসের ছয় মেয়ে । সবাইকে আমি শাশুড়ী বলেই সম্বোধন করি।

যৌথ পরিবারে আমার জন্ম হয়েছিল। জানা ছিল নিজেকে সবার সাথে সামঞ্জস্য করে চলার। সেই অভিজ্ঞতা দিয়ে রোকেয়া হলে রুমমেটদের সাথে কখনো মনোমালিন্য হয়নি। আমার কক্ষে চারটি সীট ছিল। সবচেয়ে বেশী ডাবলিং করেছি আমি। কখনো সিনিয়রিটির আধিপত্য দেখাইনি। হলে উঠার আগে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম,যে কক্ষে প্রথম উঠব,সেই কক্ষে থাকব শেষ পর্যন্ত এবং তাই করেছিলাম। তাইতো নানা জেলার মানুষের সাথে আমার দেখা হয়েছে অনেক। অনেকেই রুমমেট হিসেবে এসেছে,গিয়েছে। কিন্ত আমিই ছিলাম সবচেয়ে পুরনো। অথচ দুর্ভাগ্য শশুড়বাড়ীতে একসাথে থাকতে পারিনি। সবাই যার যার মত করে প্রতিষ্ঠিত। ঈদ এলে ভীষণ মন খারাপ হয়। মন চাইলেই যেতে পারিনা। যদিও দুই দিদি খবর নেন যেতে বলেন। আমের সময় আম পাঠিয়ে দেন। বাবা মা হচ্ছে পরিবারের শিকড়। তারাই তো নেই। মানুষের জীবনে কিছু অপূর্ণতা থাকে। আমার জীবনে প্রাপ্তি বেশী। অপূর্ণতা কম। তবে শাশুড়ীর আদর অথবা বকা অর্জন না করা ভীষণ দুর্ভাগ্যের। যখন দেখি আম্মু আমার ভাই এর স্ত্রীদের আদর করে রান্না করে খাওয়ান। তখন আমার ভিতরটা কষ্টে হু হু করে উঠে। এই ভেবে যদি আমার শাশুড়ী থাকত। তিনি বেঁচে থাকলে তাকে আমি আমার কাছে রাখতাম। আসিরের একটা সঙ্গী হতেন তিনি। একক পরিবারের সন্তান মানুষ করা কত কষ্টকর তা হাড়ে হাড়ে টের পাই প্রতিদিন। নারায়ণগঞ্জে আমরা এখনো এক উঠোনেই বাস করি। এক এক সময় ভীষণ মন খারাপ হয়। বাসার দেয়ালে শশুড় শাশুড়ীর ছবি এবং ২৩ জানুয়ারী ১৯৯২ইং তারিখে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার সরকারী কলেজের পক্ষ থেকে আব্বাকে দেয়া বিদায়ী মানপত্রও টাঙ্গিয়ে রেখেছি। বাসা থেকে যখন বের হই আব্বা আম্মার দুই ছবিতে স্পর্শ করে সম্মান দিয়ে বের হই। আসির তার পরীক্ষার সময় দাদা দাদীকে বলে যায়। দুইজনের মৃত্যৃবার্ষিকীতে নিজ হাতে রান্না করে গরীব দুঃখীকে খাওয়াই। পবিত্র কোরান খতম করাই। নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছে তাদের বেহেশত চাই। এতেই খুঁজে নেই শান্তি। যাই হউক দিনশেষে আমি গর্বিত এজন্য যে আমি চাঁপাইনবাবগঞ্জের পুত্রবধূ। আমি সবসময় একটা কথা বলি,আমি রাজধানীর মেয়ে (সোনার গাঁ,নারায়ণগঞ্জ),রাজধানীর পুত্রবধূ (কর্ণসুবর্ণ),রাজধানী (ঢাকা)তে বাস করি। আমার মত সৌভাগ্যবান কে? চাঁপাইনবাবগঞ্জ একটি সমৃদ্ধ শহর। এ শহর ছিল গৌড়ের রাজধানী। শত শত বছরের ইতিহাস এই অঞ্চলের সাথে সংশ্লিষ্ট। চাঁপাইনবাবগঞ্জকে পুরাকীর্তির মসজিদের শহর বলে আখ্যা দেয়া যেতে পারে। পর্যটন এলাকা হিসেবে আখ্যা পেতে পারে।

বিশিষ্ট কবি শহীদুল্লাহ আনসারী ‘আমের দেশে রেশমী পরশ ’ গ্রন্থ লিখেন । সে গ্রন্থের উপক্রমনিকায় আব্বু কবি মুঃ জালাল উদ্দিন নলুয়া একপর্যায়ে লিখেন ‘চাঁপাইনবাবগঞ্জের সহজ সরল মানুষ ও তাদের নির্লোভ আচরণ এবং আতিথেয়তা লেখকের দৃষ্টি কেঁড়ে নিয়েছে ’ । ঢাকার পাবলিক লাইব্রেরীতে চত্বর প্রকাশনী ও সাহিত্য পরিষদ কর্তৃক আয়োজিত গ্রন্থটির মোড়ক উন্মোচনে চাঁপাইনবাবগঞ্জের সন্তান হিসেবে মবিনকে বিশেষ অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ করা হয়েছিল। উল্লেখ্য, আব্বু ছিলেন,চত্বর ম্যাগাজিনের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ছিলেন ড. আশরাফ সিদ্দিকী। ।

লেখাটি যখন লিখছি তখন চোখে ভাসছে আব্বার সাথে ঘটে যাওয়া শত শত স্মৃতি, প্যারা মিষ্টি, কালাই রুটি, বেগুন ভর্তা, মাসকলাইর ডাল, কুমড়োর বড়ি, নকশী কাথা, কানসাটের চককীর্তি ইউনিয়নের বাড়ী। হাসপাতাল রোডের বাড়ী, মহানন্দা নদী। আর যাকে দেখিনি আমার শাশুড়ীর অস্পষ্ট ছবি। চোখ যেন ঘোলা হয়ে আসে। কলম যে আর এগুতে চায়না। দিন শেষে আমি ও আর আট দশজন সবার মতো বাঙ্গালী নারী। সবাই চায় তার শশুড় শাশুড়ীর আদর স্নেহ। বাবা মায়ের একমাত্র কন্যা সন্তান আমি। আমি ভালোবাসার কাঙ্গাল। এক আকাশ সমান ভালোবাসা পেয়ে বড় হয়েছি। কিন্ত মনের কোণে ডাক দিয়ে কে যেন বলে যায়,তোমার শশুড়বাড়ীর সবাই কই? আমি নিরুত্তর হয়ে থাকি। আমার শশুড়কে শ্রদ্ধা করে আমার গ্রন্থ ‘আলোকিত নারীদের স্মৃতিতে মুক্তিযুদ্ধ ; গ্রন্থটি উৎসর্গ করেছি। যে গ্রন্থটি পরবর্তীতে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ‘পাঠাভ্যাস উন্নয়ন কর্মসূচী’র অন্তর্ভূক্ত। আমার শাশুড়ীকে উৎসর্গ করেছি ‘মুক্তিযুদ্ধে নারী’ গ্রন্থটি, যেটি ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত হয়েছে। যাদের সন্তানের সাথে বেঁধেছে আমার জীবন। তারা আমার কাছে ভীষণ সম্মানের আদর্শের। আমি ভাগ্যবান আমি সমৃদ্ধ নগরী চাঁপাইনবাবগঞ্জের পুত্রবধূ। এডভোকেট আনজুমান আরা দিদি আমাকে ‘বোন’ ডাকেন আর ছোট দিদি ‘বুবু’ বলে ডাকেন। ভাসুররা ভীষন ভালোবাসেন। এটাই আমার প্রাপ্তি। আব্বাকে নিয়ে যে কবিতাটি লিখেছি তা আমার ‘পথের নীল ধূলো’ কাব্যগ্রন্থে প্রকাশিত হয়েছে । সেটি লিখেই শেষ করব আজকের এই লেখা-

খোলা চিঠি
শ্রদ্ধেয় আব্বা
সালাম নিবেন,
আজ এই রৌদ্রজ্জ¦ল সকালে বড় বেশী
মনে পড়ছে আপনার কথা, কেন জানিনা……….
মনে হচ্ছে সুদূর চাঁপাইনবাবগঞ্জের
বাড়ীর গেটে আপনি আমার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছেন
আমাকে দেখেই বলবেন যে
মা কেমন আছো?
অত:পর ক্লান্তিহীন ভ্রমণে আমি যখন আসব
তখন আপনি বলবেন
মা, চলো খাবে।
অত:পর আমার মাথায় আপনি
স্নেহের হাত বুলিয়ে বলবেন।
মা,মাছের মাথাটা তুমিই খাও
অত:পর খাবার সেরে আপনার সাথে কত গল্প করব।
তারপর
আব্বা, আপনি আমাকে বিদায় দিবেন
সেই বটতলা হাটের বিশাল বটবৃক্ষের নীচে দাঁড়িয়ে থাকবেন আপনি
পাঞ্জামী পরে চশমা চোখে।
আমি রিকশায় চড়ে আবেগ আপ্লুত চোখে
বিদায় নিবো।
আর পিছন ফিরে যতটুকু চোখ যায়
ততটুকুই আপনাকে দেখার চেষ্টা করব।
আব্বা,
পৃথিবীর এপারে বৃষ্টিস্নাত রাত
অথবা জোনাকজ¦লা সন্ধ্যায়।
অশ্রুসজল চোখে আপনার
কথা ভেবে অবচেতন মনে কাঁদি।
মনে মনে সেই স্মৃতিঘেরা দিনগুলোর
দিকে তাকিয়ে স্মৃতিগুলোকে রোমন্থন করি।
আর ভাবি
আবার ও যদি কোনদিন বটতলায় যাই।
তাহলে ঠিক একইভাবে আপনার
দেখা পাবো আপনার স্নেহের সান্নিধ্যে নিবো।
আমি ভাবতেই চাইনা যে আপনি নেই, আপনি আছেন
আমার মনে, ধ্যানে, আমার কাব্যিক
কল্পনায়,সব সময় সারা জীবন।

লেখক- ড. জেবউননেছা
সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান
লোকপ্রশাসন বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..

 

Copyright © All rights reserved © 2019 Kansatnews24.com
Theme Developed BY Sobuj Ali
error: Content is protected !!