শুক্রবার, ৩১ জুলাই ২০২০, ১১:১৯ পূর্বাহ্ন

আম্পান: গভীর রাতের ঝড় এবং উপকূলবাসীদের জন্য ভাবনা

ড. জেবউননেছা
  • আপডেট টাইম বৃহস্পতিবার, ২৮ মে, ২০২০
  • ৫৭ বার পঠিত

গতকাল গভীর রাত ২.০০ টায় প্রচণ্ড ঝড়ে বারান্দার শখের টব এবং টব রাখার সেলফ ভেংগে যাওয়ায় যখন প্রচণ্ড মন খারাপ হচ্ছিল। তখন উপকূলের মানুষগুলোর কথা ভীষণ মনে হচ্ছিল। তারপর থেকে ঘুম আর এলো না। একটাই প্রশ্ন ফিরে ফিরে এসেছে, কিভাবে তারা ঘর হারিয়ে, বাড়ি হারিয়ে, ফসল হারিয়ে, গবাদি পশু হারিয়ে বেঁচে থাকে, বাঁচার স্বপ্ন দেখে, ঘুরে দাঁড়ায়?

পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, এ বছর ঘূর্ণিঝড় ‘আম্পানে’ দেশের ১৩ জেলায় মোট ৮৪ টি পয়েন্টে বাঁধ ভেঙ্গেছে। যার দৈর্ঘ্য প্রায় সাড়ে সাত কিলোমিটার। সারা দেশে প্রায় ১৭,০০০ কিলোমিটার বাঁধ রয়েছে।অথচ দুর্যোগের প্রস্তুতি হিসেবে ৫,৫৫৭ কিলোমিটার বাঁধের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবুও কত বাড়ি ঘর তলিয়ে গিয়েছে,ভেসে গিয়েছে ফসল।দুর্যোগপ্রবণ এলাকার মানুষগুলো হয়ে গিয়েছে অসহায়। ১৯৭৩ থেকে ২০১৮ সন পর্যন্ত ১হাজার ৭০০ বর্গকিলোমিটারের বেশি এলাকা নদীতে বিলীন হয়েছে। এতে প্রায় ১৭ লাখ ১৫ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে(সি আইজিএস)।

 

 

‘দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসে পূর্ব প্রস্তুতি, টেকসই উন্নয়নে আনবে গতি’ – এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে এ বছর ১০ মার্চ পালিত হলো ‘জাতীয় দুর্যোগ প্রস্তুতি দিবস-২০২০’। দিবসটি উপলক্ষে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তাঁর বাণীতে বলেন, বিগত বছরগুলোতে দেশে ১০০ টি ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র, ২৫৫টি বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র, ১৯,৯৬৮ টি সেতু/কালভার্ট, ৩৪১৫ কিলোমিটার মাটির রাস্তা এইচবিবিকরণ করা হয়েছে। বর্তমানে ২২০টি ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র, ৪২৩টি বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র, ৬৬টি ত্রাণ গুদাম, ২৬৯২কিলোমিটার মাটির রাস্তা এইচবিবিকরন, ৬৪৯১টি সেতু/কালভার্ট এবং ৫৫০টি মুজিব কিল্লা সংস্কার ও নির্মাণের কাজ চললাম রয়েছে।’ এই বাণীটি থেকে বুঝতে বাকি নেই সরকার তার সাধ্যমতো চেষ্টা করে যাচ্ছে প্রাকৃতিক দুর্যোগকে প্রতিরোধ করার জন্য।

কিন্ত প্রাকৃতিক দুর্যোগ তো বলে আসেনা।এই যে হানা দিল ‘আম্পান’। অকস্মাৎ এই ঘূর্ণিঝড়ে গাছ গাছালী, বাড়ি ঘরের যথেষ্ট ক্ষতি হয়েছে।তবে সরকার তার দূরদর্শিতা দিয়ে মানুষকে নিরাপদে রাখার চেষ্টা করেছে।তবু ভেংগে গিয়েছে বাঁধ। তলিয়ে গিয়েছে গ্রামের পর গ্রাম।

ছোটবেলা থেকে গণমাধ্যমে দেখে আসছি রাস্তা ও বাঁধ ভেংগে যাওয়ার খবর। তখন বুঝতাম না কেন বারে বারে রাস্তা ও বাঁধ ভেংগে যায়। পরিণত বয়সে এসে বুঝতে বাকি নেই, বাঁধ গুলো কেন ভেংগে যায়।আচ্ছা, বাঁধগুলো নির্মাণের পূর্বে কি সম্ভাব্যতা যাচাই করা যায় না? বাঁধগুলোকে কি টেকসই করে নির্মাণ করা যায় না? সরকার তার সাধ্যমতো অর্থ বরাদ্দ প্রদান করে। কিন্ত তার সদ্ব্যবহার হয়ে কিনা সেটি নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে।ছেলেবেলা আমাদের এলাকায় দেখতাম বছর না পেরোতেই বড় বড় হলুদ রংগের গাড়ি আসত।রাস্তাগুলোতে পীচ ঢেলে ঢেলে সংস্কার করা হতো। আমি নারায়ণগঞ্জের নিতাইগঞ্জ এলাকার সন্তান। আমার জন্ম, কলেজ পর্যন্ত লেখাপড়া সব অই জায়গায়। আমার মনে পড়েনা আমি নিতাইগঞ্জ খালঘাট এলাকার রাস্তাটিকে বছরের সব সময় পাকাপোক্ত দেখেছি। বৃষ্টি হলেই জায়গাটি কর্দমাক্ত হয়ে যায় এবং রাস্তা ভেংগে যায়।

 

 

আজ যখন ঢাকায় বসে লিখছি, জন্মস্থান নারায়ণগঞ্জের ভাংগা রাস্তার কথা চোখে ভাসছে। কেন যেন মনে হচ্ছে, আজও বৃষ্টিতে নাকাল হয়ে আছে রাস্তাটি। আচ্ছা, এর কারণ কি, একটি রাস্তা কি এক বছরের জন্য নির্মান করা হয়? রাস্তা তৈরীর সরঞ্জাম যদি ঠিকমতো দেয়া হয়,তাহলে প্রতি বছর সংস্কারের প্রশ্ন আসেনা।ঠিক তেমনি বাঁধ তৈরীর সরঞ্জাম যদি ঠিকমতো দেয়া হয় তাহলে প্রতি বছর বাঁধগুলো ভেঙ্গে যাবার কথা নয়।সর্বস্তরের জবাবদিহিতায় নিশ্চিত হতে পারে মুক্তির পথ। গত রাতের বৃষ্টিতে রাজধানী ঢাকায় বেশ কিছু এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। গণমাধ্যমে দেখতে পেলাম, কোন কোন এলাকার অধিবাসীরা বলছে, একটু খানি বৃষ্টি হলেই জল আটকে যায়।

মনে পড়ে, ২০০৪ সনে ঢাকায় প্রচন্ড বৃষ্টিপাত হয়েছিল। তখন আমি কলেজ গেট ইউএনডিপি প্রকল্পে কর্মরত।অফিসে মুঠোফোন, ব্যাগ রেখে হাতে কয়টা টাকা নিয়ে মতিঝিলের বাসার উদ্দেশ্যে বেরিয়েছিলাম। প্রচন্ড জলাবদ্ধতায় মতিঝিলের একটু আগে গাড়ি নামিয়ে দিয়েছিল। তখন বুক সমান পানি পাড়ি দিয়ে বাসায় গিয়েছিলাম। নটরডেম কলেজের সামনের দিকে গলা সমান পানিতে ডুবে গিয়েছিলাম। তখন ২০০৪ এখন ২০২০।

সময়টার ব্যবধান ১৬ বছর। তখনও ধানমন্ডির ২৭ নম্বর দিয়ে যখন গিয়েছি জলাবদ্ধতা পেরিয়ে। আজও গণমাধ্যমে শুনছি ধানমন্ডিসহ ঢাকার বেশ কয়েকটি স্থানে জলাবদ্ধতা হয়েছে। বর্ষাকালে অপরিকল্পিত রাস্তা খোড়াখুড়ি, অপরিকল্পিত নগরায়ন, যত্রতত্র ভবন নির্মাণের জলাশয় ভরাটের কারণে আজ রাজধানীবাসী ও একটুখানি বৃষ্টিতে নাকাল হয়। তাহলে উপকূলের সাথে রাজধানীর কি পার্থক্য রইল? উপকূল তো ঝড়, জলোচ্ছাসে ক্ষতিগ্রস্থ হয়। আর রাজধানিতে তো বৃষ্টি হলেই নাকাল হয় মানুষ। দুর্যোগ যে কোন জায়গায় যেকোনো ভাবে আঘাত হানতে পারে। দুর্যোগ মানে ব্যক্তি বা জনগোষ্ঠীর স্বাভাবিক জীবনধারা ব্যাহত হয় এবং পারিপার্শ্বিকতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এসব দুর্যোগ হয় দুই কারণে একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ আর একটি মনুষ্য সৃষ্ট দুর্যোগ।প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ঝুঁকির মধ্যে থাকা শীর্ষ ১৫ টি দেশের তালিকায় বাংলাদেশ নবম স্থানে রয়েছে। জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ে বাংলাদেশে প্রতিবছর ২৫,৬০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়। যা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ২.২%।

বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে ২০০০ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশে ৮০,০০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য(এসডিজি) তে ১৩ নম্বর ধারা অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তন ও এর প্রভাব মোকাবিলায় জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। একটি ঘূর্ণিঝড় কোন একক বিষয় নয়। এর সাথে কৃষিকাজ ও কৃষি অর্থনীতি, খাদ্যসংকট, রোগ বালাই, যোগাযোগ ব্যবস্থা, শিক্ষ্যা ব্যবস্থা জড়িত। জড়িত মৎস্যচাষ এবং ক্ষেত খামার, গবাদি পশু। মোদ্দা কথা, পুরো জীবন পদ্ধতিই একে অপরের সাথে জড়িত। পুরো পদ্ধতিকে সংস্কার করে আমাদের সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে।

গত রাত থেকেই উপকূলের মানুষগুলোর জন্য হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। বারে বারে ডুকরে ডুকরে কান্না আসছে। জানিনা কেন এমন লাগছে। গণ মাধ্যমে দেখা মানুষগুলোর চেহারাগুলো চোখে ভাসছে, আসুন আমাদের সাধ্যমতো মানুষগুলোর পাশে দাঁড়াই। ভরসা দেই তাদের।আপনার আমার একটু অনুদান সাহায্য মানুষগুলোর মুখে হাসি ফুটবে। সরকারের পাশাপাশি বিত্তবানদের দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষগুলোর পাশে দাঁড়ানো প্রয়োজন। সম্পদের পাহাড় গড়ে লাভ কি। যদি মানুষের কাজেই না লাগতে পারি। তাছাড়া আমি ভাল থেকে লাভ কি আমার দেশের মানুষগুলোই যদি ভাল না থাকে। সবাই ভাল থাকলেই ভাল থাকা। করোনা ভাইরাস আমাদের চোখ খুলে দিয়েছে।এই অল্প সময়ের জীবনে মানুষের জন্য কিছু একটা করে যাওয়াই জীবনের সার্থকতা।

সেই সাথে সরকারি পর্যায়ে দুর্গত এলাকার জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ সঠিকভাবে বন্টন হচ্ছে কিনা সেটা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা ভীষণ প্রয়োজন। ত্রাণের টিন, চাল, বস্ত্র, খাদ্য যেন কোন রাঘব বোয়ালের খপ্পরে পড়ে না যায় সেগুলোর দিকে দৃষ্টিপাত করা প্রয়োজন। বাঁধ নির্মাণের অর্থ দিয়ে সত্যিকারের বাঁধ নির্মাণ হচ্ছে কিনা সেটা নিয়ে ভাবার সময় এসেছে।

২০১৪ সালে জাতিসংঘ মানবিক সহায়তা সমন্বয়কারী সংস্থা (ইউএনওসিএইচএ) উদ্যোগে সিভিল মিলিটারি সমন্বয়ের মাধ্যমে বড় ধরনের দুর্যোগ মোকাবেলার জন্য ২০১৪ সালে মানবিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে একক প্লাটফর্ম হিসেবে রিজিওনাল কনসাল্টেটিভ গ্রুপ (আরসিজি) গঠন করা হয়। বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত তৃতীয় সম্মেলনে ২৬ টি সদস্য রাষ্ট্রসহ ২৪ আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সংস্থার ১২০ জন প্রতিনিধি অংশ নেন। সেই সম্মেলনে ২৪ জানুয়ারি, ২০২০ সনে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী উদ্বোধন অনুষ্ঠানে দুর্যোগ প্রতিরোধ করতে না পারলেও দূরদর্শী কাজের মাধ্যমে এর ক্ষয়ক্ষতির পরিমান কমানো যায় এ ধরনের কর্মসূচির উপর তিনি জোর দিয়েছিলেন।’ এই কথাটির সাথে আমি পুরোপুরি একমত। আমাদের দরকার দুর্যোগ প্রতিরোধে দূরদর্শী পরিকল্পনা।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৩ সালে ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচি (সিপিপি) গ্রহণ করেছিলেন।দূরদর্শি পরিকল্পনা একেই বলে। বর্তমানে দুর্যোগের আগাম সতর্কবার্তা ও দৈনন্দিন আবহাওয়া বার্তা জানতে মুঠোফোনে ১০৯০ ( টোল ফ্রি) আইভিআর পদ্ধতি চালু করা হয়েছে।আমাদের সকলের আন্তরিকতা, বিত্তবানদের সাহায্যের হাত প্রসারিত করে সরকারের দুর্যোগসংক্রান্ত সমস্ত প্রকল্পগুলোতে দুর্নীতির কালো ঘোড়াকে হটিয়ে একদিন এই দেশ হবে অন্যতন দুর্যোগ প্রতিরোধকারী একটি দেশ। নইলে পল্লীকবি জসীমউদ্দিনের ‘আসমানী’ কবিতার শেষ কয়টি চরণের কথাই মনে পড়বে বারংবার,

‘আসমানীদের বাড়ির ধারে পদ্ম-পুকুর ভরে

ব্যাঙের ছানা শ্যাওলা -পানা কিল -বিল- বিল করে।

ম্যালেরিয়ার মশক সেথা বিষ গুলিছে জলে,

সেই জলেতে রান্না – খাওয়া আসমানীদের চলে।’

লেখক:
ড. জেবউননেছা
সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান,
লোকপ্রশাসন বিভাগ,
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..

 

Copyright © All rights reserved © 2019 Kansatnews24.com
Theme Developed BY Sobuj Ali
error: Content is protected !!