শনিবার, ০৬ জুন ২০২০, ০৯:৪৬ পূর্বাহ্ন

জড়সড় চামড়া, তবুও হাতে দাঁড়িপাল্লা!

আমানুল্লাহ আমান:
  • আপডেট টাইম শুক্রবার, ২২ মে, ২০২০
  • ৩৮ বার পঠিত

মেরেজান বেগম। বয়স ৭০। বাসা রাজশাহীর পবা উপজেলার শিতলাই গ্রামে। স্বামীকে হারিয়েছেন প্রায় ৪০ বছর আগে। বছর পাঁচেক আগে একমাত্র মেয়ে মর্জিনা পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিয়েছেন। রেখে গেছেন তিন সন্তান। তিন যুগেরও অধিক সময় ধরে জীবনযুদ্ধে লড়াই করে বেঁচে আছেন মোরেজান। স্বামী হাসেন আলীকে হারিয়ে তার জীবনে নেমে আশে ঘোর অমানিশা। যুদ্ধটা শুরু তখন থেকেই।

পরিবারে উপার্জনক্ষম কেউ নেই। বাধ্য হয়ে নিজের কাধে তুলে নেন সংসারের দায়িত্ব। সকালে সূর্য উঠার সাথে সাথে শুরু হয় খাদ্যের সন্ধানে নিরলস পরিশ্রম। সেই উপার্জনের পয়সা দিয়ে বিয়ে দিয়েছেন দুই নাতনীর। এখন ঠিকমতো দুমুঠো খাবার খেতে পারাটাই মেরেজানের তৃপ্তি।

দৈনিক কোনো আয় নেই। মাঝেমধ্যে কিছু উপার্জন করলেও তা ৫০-৬০ টাকার বেশি নয়। তবুও আহারের তাগিদে জীবনের সাথে লড়াই করে যাচ্ছেন প্রতিনিয়ত। গ্রামে ছেলেদের কাছ থেকে কিনছেন কাঁচা আম। সেসব আম বস্তায় পুরে ১২ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে শহরে বাজারে বিক্রি করছেন। কিনছেন ৫-৬ টাকা কেজি দরে। আর প্রতি কেজি বিক্রি করছেন ১০ টাকায়। কখনো কখনো ৫ টাকা কেজিই বিক্রি করে দিচ্ছেন! লাভ-লোকসানে ঢেউ খেলছে তার জীবন।

গত ৫ মে, দুপুর সাড়ে ১২টা। প্রচণ্ড রৌদ্রময় আকাশ। রাজশাহীর কোর্ট বাজারে দেখা গেলো এক জীবন্ত যোদ্ধাকে। লকডাউন শিথিল করায় রোদের প্রখরতা উপেক্ষা করেই চলছে সবজি বেচাকেনা। সবজি বিক্রেতারা মাথার ওপর চালা টাঙ্গিয়ে বসেছেন। কারো কারো মাথায় আছে ছাতা। কিন্ত ৭০ বছর বয়সী এক বৃদ্ধা প্রখর রোদে বস্তায় কয়েক কেজি আম নিয়ে বসেছেন মহাসড়কের পাশে। শরীরের চামড়াগুলো জড়সড় হয়ে গেছে। তবুও হাতে দাঁড়িপাল্লা। তিনিই মেরেজান!

তীব্র রোদে বসে থেকে চেহারাটা ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। মহাসড়কে চলাচল করছে ট্রাক-সিএনজি-অটোরিকশা। তার পাশেই ঝুঁকি নিয়ে বসেছেন তিনি। আম বিক্রি না হলে খাবেন কি–এই চিন্তায় উঠতেও পারছেন না। তীব্র গরমে মেরেজান বেগমের কষ্ট দেখে এক সবজি বিক্রেতা তার ছাতা এগিয়ে দিলেন।

দীর্ঘ সময় আম নিয়ে বসে থাকলেও কেউ কিনছেন না। কেউ কেউ দূরে থেকেই চলে যাচ্ছেন। বিক্রি হয় নি আগের দিনের আমও। বাধ্য হয়ে সেখানে বস্তাসহই ফেলে রেখে গেছেন। করোনা মহামারীর মধ্যেও লম্বা পথ পাড়ি দিয়ে পরেরদিন একই জায়গায় বসলেও আম কেউ কিনতে আগ্রহী হচ্ছেন না। আম কেনা টাকা তো ফেরত পেলেনই না, বরং গাড়িভাড়ার টাকাটাও নেই!

এ তো শুধু আমের মৌসুমের লড়াই। বছরের অধিকাংশ সময় বাড়ির আনাচে কানাচে পড়ে থাকা গরুর গোবর কুড়িয়ে গ্রামীণ জ্বালানী ‘ঘুঁটে’ তৈরি করে বিক্রি করেন। শেষ বয়সে এসেও এভাবে লড়াকু জীবনযাপন করছেন স্বামী-সন্তানহারা মেরেজান।

স্থানীয় কয়েকজনের সহযোগিতায় বয়স্ক ভাতার কার্ড পেয়েছেন। তবে দফায় দফায় সরকারী ত্রাণ বিতরণ হলেও একবার তার ঝুঁলিতে জুটেছে মাত্র পাঁচ কেজি চাল! যদিও প্রতিটি কার্ডে সর্বনিম্ন ১০ কেজি চাল বরাদ্দ আছে। এছাড়া এগিয়ে আসেননি কোনো জনপ্রতিনিধি। সাহায্যের হাত বাড়ায়নি কোনো স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বা দাতব্য সংস্থা। সরকারী বরাদ্দকৃত তার নামের অর্ধেক চাউলও গেছে অন্যদের ঘরে।
সুপার সাইক্লোন আম্পানের তাণ্ডবলীলার পর তার টিন আর খড়ের তৈরি বাড়িটির কি দশা–সেটি দেখতেও যাননি কোনো জনপ্রতিনিধি।

তবে কোনো অনিয়ম ছাড়াই সঠিকভাবে ত্রাণ বিতরণ করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন শিতলাই ইউনিয়ন পারিষদের চেয়ারম্যান আব্দুস সালাম।

মেরেজান আক্ষেপের স্বরে জানালেন তার বেদনার কথা। বললেন- ‘ব্যাটা, একবারে আমি মিথ্যা কথা বুইলবো না। আমাক ৫ কেজি চাল দিয়্যাছে, আমার গেরামের লোক। চেয়ারম্যান-মেম্বার কেউ দেখাও করে না, কিছু দেয়ওনা। স্বামী-ছেলেমেয়ে কেহু নাই। দুই ভাই আছে। কিন্ত কেহু খোঁজখবর রাখে না। ঝড় যায় বৃষ্টি যায়–এর মইদ্দে কি কষ্টে দিন কাটে আমিই জানি।’

দীর্ঘ সময় আলাপচারীতার পর মেরেজান বিদায়টাও দিলেন অশ্রুসিক্ত নয়নে। বললেন, ভাই! ভাল থাকিস। আমাক তো কেহু মনে রাখে না। পারলে তোর দাদিটাকে একটু মনে রাখিস। চলে আসার সময় পিছু ফিরে দেখা গেলো তার বিবর্ণ চেহারাটা। দু’নয়নে যতদূর দেখতে পেলেন মেরেজান ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়েই রইলেন…

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..

 

Copyright © All rights reserved © 2019 Kansatnews24.com
Theme Developed BY Sobuj Ali
error: Content is protected !!