রবিবার, ০৯ অগাস্ট ২০২০, ০২:১৬ অপরাহ্ন

সুরকার আজাদ রহমান কাক্কুর স্মৃতিকথা

ড. জেবউননেছা
  • আপডেট টাইম রবিবার, ১৭ মে, ২০২০
  • ৫৩ বার পঠিত

কয়দিন ধরে মনটা বিষন্ন হয়েই থাকছে। একটার পর একটা খারাপ খবর শুনতে শুনতে আর ভালো লাগছে না। এমনিতেই করোনাভাইরাসের প্রকোপে সারা বিশ্বের বাতাস ভারী হয়ে আছে। তার মধ্যে বাংলাদেশের মুখ উজ্জ্বল করা জ্ঞানী গুণী মানুষগুলো একে একে চলে যাচ্ছেন। গতকাল চলে গেলেন প্রখ্যাত সুরকার আজাদ রহমান কাক্কু। কয়দিন পূর্বে চলে গেলেন জাতির বাতিঘর অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান স্যার। তার কয়দিন পূর্বে চলে গেলেন অধ্যাপক ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী স্যার। আজ সকালে চলে গেলেন মুক্তিযোদ্ধা মমতাজ আপা। যেন সবাই পণ করেছেন একসাথে আমাদের ছেড়ে চলে যাবেন। প্রতিভাবান এই নক্ষত্রবৃন্দ জাতির জন্য ছিল উপহার।

সাহিত্যসেবী পরিবারে আমার জন্ম হওয়াতে শিল্পী সাহিত্যিক এবং গুনী ব্যক্তিদের স্নেহ সান্নিধ্য পেয়েছি। ছয় বছর বয়স না হতেই আব্বুর সাথে বিভিন্ন সাহিত্যসভা অনুষ্ঠানে গিয়েছি। তারই ধারাবাহিকতায় রাজধানী ঢাকার কায়কোবাদ সাহিত্য মজলিসের সাহিত্য সভায় আব্বুর সাথে বেশ কয়েকবার যাবার সৌভাগ্য হয়েছিল। আব্বু ছিলেন উক্ত সংগঠনের কার্যকরী পরিষদের সদস্য। তখন সভাপতি ছিলেন কবি দেওয়ান মো. শামসুল হক। উক্ত সংগঠনটি সংবর্ধনা প্রদান করেছেন প্রিন্সিপাল ইব্রাহিম খা, কবি সুফিয়া কামাল, জ্ঞানতাপস অধ্যক্ষ দেওয়ান মো. আজরফ এবং দেওয়ান মো. আব্দুল হামিদকে। এই সংগঠনটিতে সুরকার আজাদ রহমান কাক্কুর নিয়মিত আসা যাওয়া ছিল।

আমাদের পারিবারিক রেকর্ডপত্র ঘেটে দেখা যায়, ২৬.৭.১৯৮৯ইং তারিখে দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় প্রকাশিত সংগঠন সংবাদ কলামে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়। সংবাদটি ছিল এরকম,‘কায়কোবাদ সাহিত্য মজলিসের উদ্যোগে সম্প্রতি চন্দ্রিকা সাহিত্য বাসরে মহাকবি কায়কোবাদের ৩৮ তম মৃত্যুবার্ষিকী উদযাপিত হয়। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ড. আশ্রাফ সিদ্দিকী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রধান ড. আবুল কাশেম মনজুর মোর্শেদ প্রধান অতিথি এবং মিউজিক কলেজের অধ্যক্ষ আজাদ রহমান বিশেষ অতিথির আসন অলংকৃত করেন। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন দেওয়ান শামসুল হক ও কবি ও নাট্যকার মু. জালাল উদ্দিন নলুয়া (আব্বু)।’ উক্ত অনুষ্ঠানে আমি আব্বুর সাথে গিয়েছিলাম। উক্ত সভাটি ২১.-০৭.১৯৮৯ইং তারিখে দেওয়ান মো. শামসুল হকের বাড়িতে ২১-০৭-৮৯ইং তারিখে অনুষ্ঠিত হয়। সাহিত্যজগতে আব্বুর বন্ধুদের আমি ‘কাক্কু’ বলি। আজাদ কাকাকে ও ‘কাক্কু’ বলেই সম্বোধন করতাম।

মু. জালাল উদ্দিন নলুয়া’র জীবনের এক টুকরো স্মৃতি গ্রন্থ থেকে জানা যায়, ০৫-০৩-৭২ইং তারিখে আয়োজিত কায়কোবাদ সাহিত্য মজলিশের প্রথম সাহিত্যসভা অনুষ্ঠিত হয়। তখনকার সময়ে কায়কোবাদ সাহিত্য মজলিস রাজধানী ঢাকার হাতে গোনা কয়েকটি সংগঠনের মধ্যে প্রথম সারির সংগঠন। কবি দেওয়ান আব্দুল হামিদ ছিলেন কায়কোবাদ সাহিত্য মজলিসের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক। তারই ধারাবাহিকতায় ১১.০৪.১৯৯২ইং তারিখে বাংলা মরমী গানের শিল্পী কবি গীতিকার,প্রবন্ধকার সাবির আহমেদ চৌধুরী কাক্কুর বাসায় ধারাবহিক কায়কোবাদ সাহিত্য মজলিসের সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। উক্ত অনুষ্ঠানে ও আজাদ কাক্কু উপস্থিত ছিলেন।

ছেলেবেলা থেকে আমার শখ ছিল জ্ঞানী ব্যক্তিদের অটোগ্রাফ সংগ্রহ করা। উক্ত অনুষ্ঠানে শিশু আবৃত্তিকার হিসেবে আব্বুর সাথে গিয়েছিলাম। সেদিন সংগীত পরিচালক আজাদ রহমান কাক্কু আমাকে লিখে দিয়েছিলেন, ‘মানুষ হও’। বাংলা একাডেমির বার্ষিক সাধারণ সভায় নিয়মিত আজাদ রহমান কাক্কু আসতেন। এইতো ২০১৯ সালের বইমেলায় আব্বুর সাথে আজাদ কাক্কুর সাথে আব্বুর দেখা হলো। আব্বু আমার সম্পাদিত ‘বঙ্গবন্ধু,একুশ ও নির্বাচিত কবিতা’ গ্রন্থ হাতে দিয়ে বললেন,‘ উক্ত গ্রন্থের ৭০ পৃষ্ঠায় কায়কোবাদ সাহিত্য মজলিসের স্মৃতি নিয়ে আমার লেখা একটি কবিতা রয়েছে। যেখানে আপনার ও নাম রয়েছে।’ কাক্কু বললেন, বাড়ীতে গিয়ে পুরো বইটি পড়ব।

উল্লেখ্য, এই কবিতাটি রাজধানী থেকে প্রকাশিত ‘আলোর ফোয়ারা’ নামক পত্রিকায় ৬.১০.২০১০ইং তারিখে প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে আমার সম্পাদিত ‘মু. জালাল উদ্দিন নলুয়া রচিত বঙ্গবন্ধু,একুশ ও নির্বাচিত’ কাব্যগ্রন্থে প্রকাশিত হয়।

কান্ডারি

(অধ্যক্ষ দেওয়ান মো. আজরাফ স্মরণে)

কায়কোবাদের সভায়,

গোলাপ-চামেলী- জবায়

ফুটেছে কতো লেখক কবি

সাজ সাজ রব তাই

কবি গণে ছোঁয়া পাই
খুজেঁ ফিরি হৃদয়ের ছবি

আশ্রাফ সিদ্দিকী মহান

সুরকার আজাদ রহমান

পরিচালক হামিদ ভাই-

শামসুল হক রাখেন মান

সাথে খলিলুর রহমান
মৃধা ভাইকে পাশে পাই

শিক্ষা দীক্ষার ভান্ডারী

জ্ঞানী-গুনীর কান্ডারী

সকলের শিরোমনি যিনি

সাবির চৌধুরীর বাড়ীতে

সাহিত্যে ইফতারিতে
দেওয়ান আজরফ তিনি।

বাংলাদেশের সাহিত্য-সংস্কৃতি- শিল্প সাধনা করে আমাদেরকে পরিপূর্ণ করে রাখা জ্ঞানী গুণী ব্যক্তিবর্গ মানুষগুলো ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছেন। তবে এসকল জ্ঞানী ব্যক্তিবর্গের প্রস্থান হয়না কখনো। সুরকার আজাদ রহমান কাক্কু বাংলাদেশের সংগীত জগতকে তাঁর সুরের ধারায় সমৃদ্ধ করেছেন। তিনি চলে গিয়েছেন,রেখে গেলেন, ‘জন্ম আমার ধন্য মাগো’ গানের সুর। সবাইকেই চলে যেতে হবে। কিন্ত আজাদ রহমান কাক্কুদের চলে যাওয়া দেশের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। এমন একজন গুণী ব্যক্তির স্নেহ সান্নিধ্য আমাকে পূর্ণ করেছে। সেজন্য আমি নিজেকে ধন্য মনে করছি। গতকাল থেকে কাক্কুর দেয়া অটোগ্রাফটি দেখেছি শতবার। তিনি বলে গিয়েছেন, ‘মানুষ হও’। জ্বী কাক্কু, দোয়া করবেন প্রকৃত মানুষ যেন হয়ে উঠতে পারি সেই চেষ্টা করে যাচ্ছি দিনমান। আমার বাড়ীর পাশে শ্যামলীর স্পেশালাইজড হাসপাতালে আপনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন। দুর্ভাগা আমি, লক ডাউনের নিয়ম মানেতি গিয়ে আপনাকে শেষ শ্রদ্ধা দিতে পারিনি। আপনি আজীবন শ্রদ্ধার পাত্র হয়েই থাকবেন কাক্কু। ওপারে ভালো থাকবেন কাক্কু। আমরা না হয় এপারে সংগীতরে সুরের মূর্ছনায় আপনাকে স্মরণ করব।

লেখক:
ড. জেবউননেছা
সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান,
লোকপ্রশাসন বিভাগ,
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..

 

Copyright © All rights reserved © 2019 Kansatnews24.com
Theme Developed BY Sobuj Ali
error: Content is protected !!