রবিবার, ০৯ অগাস্ট ২০২০, ১১:০৫ পূর্বাহ্ন

স্মৃতির অরণ্যে নিজেকে খুঁজি-আত্মজীবনী পর্ব-৪

ড. জেবউননেছা
  • আপডেট টাইম শনিবার, ১৬ মে, ২০২০
  • ৬৬ বার পঠিত

বেশিরভাগ মানুষের শৈশব কাটে প্রজাপতির মত উড়ন্ত, দুরন্ত, অশান্ত। আমার শৈশব প্রজাপতি, দোয়েল আর ফড়িং এর মত ছিলনা। শিল্প নগরীতে বড় হয়েছি দেখা হয়নি মেঠো পথের, সবুজ ঘাসের, খাল-বিল পুকুরের। তাই আফসোস ও অনেক। মেঠো পথে যার শৈশব বেড়ে উঠেনি, সে মাটির ঘ্রাণের মূল্য বুঝবে কি করে? এটাই স্বাভাবিক। তবে আমার ও সম্পর্ক হয়েছিল মাটির সাথেই। কেননা, আমার শৈশব কেটেছে সাহিত্য বলয়ে, সংস্কৃতির সবুজ প্রান্তরে। সাহিত্য-সংস্কৃতির মাঝেই আমি ঘুরে বেড়িয়েছি সবুজ গ্রাম। নারায়ণগঞ্জের ‘সাহিত্য পল্লী’ নামে খ্যাত শীতলক্ষ্যার তীর ঘেষে ‘নলুয়া’ নামক গ্রামে আমার জন্ম। আমি নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করি, এজন্য যে, আমি আমার জীবনের প্রথম দিন থেকে কবে কখন আমার নাম রাখা হয়েছিল, কখন কথা বলতে শিখেছি। সব কিছুই যেন পানির মত চকচকে। কেননা, আব্বু দিনলিপি লিখতেন ১৯৬৯ ইং থেকে। সেই সুবাদে শৈশবের সমস্ত ঘটনা দিনলিপি থেকে জেনেছি। ২৪ চৈত্রের খরতাপে মায়ের কোলে এক পশলা বৃষ্টি হয়ে সকাল ৫.৫৫ মিনিটে সোমবার এসেছিলাম সাহিত্যাঙ্গণের করিম ভিলায়। জন্মের দুই দিনের দিন দাদী আমার নাম রাখেন ‘জেবউননেছা’। যে নামের অর্থ ‘নারীদের অলংকার’। আমার দাদী কেরানীগঞ্জের আটি ভাওয়াল উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় (প্রতিষ্ঠাকাল :১৯৫৬) এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা আলহাজ গফুর ভূইঁয়ার কন্যা। ছোটবেলায় আমার একটি শখ ছিল বিশিষ্ট ব্যক্তিদের অটোগ্রাফ নেওয়া। সে সুবাদে সাংবাদিক গিয়াস কামাল চৌধুরী লিখেছেন, আপনার ঐতিহাসিক নাম যেন বৃথা না হয়,এই দোয়া ও শুভ কামনা সহ”।

নানা বাড়ীর পরিবারের বড় নাতনি ছিলাম। তাই নানা-নানী, মামা, খালাদের ভালোবাসার স্রোতে ভেসেছি আজ অবধি সে ভালোবাসায় ভাসছি। জন্মের দুই মাসের সময় নানু ভাই অনেক উপহারের মাঝে দিয়েছিলেন এক জোড়া নূপুর। কে জানত সে নূপুরের নিক্কনে আমার জীবন এতটাই সুরললিত হবে। আকাশ সমান ভালোবাসায়ও আদরে কেটেছে আমার শৈশব। দেড় বছর বয়সে আব্বু আম্মুর হাত ধরে ঢাকা শিশু পার্কে ঘুরেছি। দ্ইু বছর বয়সে আব্বা আম্মা ডেকেছি। ডেকেছি কাকা। শিখেছি ১৫ টি শব্দ। আম্মু আমার বর্ণমালার শিক্ষক, আরবীর ওস্তাদ,কবিতা আবৃত্তির প্রশিক্ষক। তিন বছর এক মাস বয়সে হাতে নেই ‘আদর্শ লিপি’। তিন বছর পূর্ণ হবার দুই দিন আগে ‘অ’ শব্দটি লিখতে শিখি । আমার নাম লিখতে শিখি তিন বছর একুশ দিনের সময়। পাঁচ বছর পূর্ণ হবার দুই দিন আগে হাতে নেই আরবী কায়দা। আট বছর আট মাসে পবিত্র কোরান শরীফ পড়ে শেষ করি। দু’বছর বয়সেই আব্বু আম্মুর সাথে নামাজে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতাম। যেমন ধর্মীয় অনুশাসনে বড় হয়েছিলাম তেমনি সাংস্কৃতিক অঙ্গণ চষে বেড়িয়েছি তিন বছর বয়স থেকে আব্বু আম্মুর হাত ধরে। দিনলিপি থেকে জানা যায়, দুই বছর বয়সে আব্বুর লেখা নাটক ‘বাংলা আমার বাংলা’ মঞ্চস্থ হয় নারায়ণগঞ্জের আলী আহমদ চুনকা পাঠাগারে। আমি ছিলাম মায়ের কোলে। নাটকে একটি অবাঙ্গালীর চরিত্র ছিল। যে চরিত্রে আব্বু অভিনয় করেছিলেন। আমি আব্বুকে মঞ্চে উসকো খুসকো অবস্থায় দেখে দর্শক সারি থেকেই ‘আব্বু’‘আব্বু’ বলে চিৎকার করতে থাকি। কে জানত আজ এতটা বছর পর এই নাটকটি আমার হাতে সম্পাদিত হবে। তবে আব্বু ঐ সময়ে নাটকটি আমাকে উৎসর্গ করেছিলেন।

আমাদের দোতলা বাড়ীর ছাদ থেকে দেখা যেত লক্ষ্যা নদী। বিকেল বেলা আব্বু আম্মু আমাকে নিয়ে ছাদে উঠতেন। আব্বু আমার জন্য ঢাকার ধুপখোলা মেলা থেকে কাঠের ঘোড়া কিনেছিলেন। মাথায় পরচুলা লাগিয়ে সেই কাঠের ঘোড়ায় চড়ে ছাদে বসে নদীর দিকে তাকিয়ে থাকতাম। মেজ চাচা চলচ্চিত্রে অভিনয় করতেন। পরচুলাটি তারই ছিল। দুই বছর তিন মাসের সময় আব্বুকে বলেছি, আমি নদীতে যাব। প্রতি শুক্রবারে আব্বুর সাথে আমরা তিন ভাইবোন নদীর পাড়ে বেড়াতে যেতাম। নদীর পাড়ের সাথে ছিল শিশু পার্ক। ফেরার সময় তিনভাই বোন শিশু পার্কে খেলাধূলা করে বাড়ী ফিরতাম। সেই শিশুকালে বুকের ভিতর বয়ে যাওয়া নদীর শ্রোতে ভাসতে ভাসতে পরিণত বয়সে এসে ভ্রমণ কাহিনী লিখেছি। বইটার নামকরণ করেছি ‘লক্ষ্যা থেকে পিয়াসী’।

নানু বাড়ী ছিল শীতলক্ষ্যা নদীর ওপারে। শৈশবে আমার একজন ভালো বন্ধু ছিল। সে আমার ছোট খালা মনি। আমার তিন বছরের বড় ছিল বয়সে । নানা বাড়ীর পাশে শান বাধাঁনো ঘাট,তার পাশে ছিল বকুল ফুলের গাছ। যে গাছের ফুল কুঁড়িয়েছি খালা মণির সাথে। নানীর হাতে পিঠার স্বাদ এখনো জিভে লেগে আছে। আমার বড় মামা তার নিজের সন্তানের চেয়ে বেশী স্নেহ করতেন আমাকে। নানা আমাকে নিয়ে যখন ঘুরতে বেড়োতেন তখন বলতেন, আমার নাতনি বড় হলে ব্যরিষ্ট্যার হবে। নানার কথামত তা হতে পারিনি। কি›তু নানার কথা আজ ও কানে বাজে। আজ ও নানা বাড়ীর সে পুকুর ঘাট রয়েছে। সবই আছে আগের মত। কিন্তু নানা নানী,ছোট খালা,বড় মামা পাড়ি জমিয়েছেন পরপারে। হাজারো স্মৃতি ভীড় করছে মন মাঝে। কোনটা রেখে কোনটা লিখি।

আমাদের এলাকায় মুসলমান এবং হিন্দুদের ধর্মীয় উৎসবে রঙ্গীণ আলোকমালা দিয়ে সাজানো হতো। এত আলোকমালা দিয়ে সাজানো হতো যে রাতের অন্ধকার মিলিয়ে যেত। আব্বুর সাথে সন্ধ্যায় বের হতাম দেখার জন্য। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মাঝে বড় হয়েছি বিধায় আমাদের এলাকায় সকল হিন্দু-মুসলিম সবার আনন্দ উপভোগ ছিল একসাথে। বাড়ীর পাশে যেমন মসজিদ রয়েছে, তেমন রয়েছে মন্দির। আব্বু পূজার সময় আমাদের জন্য চিনির তৈরী হাতি-ঘোড়া নিয়ে আসতেন । আমি সেগুলো সাজিয়ে রাখতাম। প্রতিদিন একটা একটা করে খেতাম।

ঈদের সময় ছোটবেলা থেকেই জামা কাপড়ের রং এর সাথে ম্যাচিং করে জুতা,মাথার বেন্ট,নেল পলিশ,লিপষ্টিক,টিপ কিনে দিতেন আম্মু। যখন যে ফ্যাশনের জামা,জুতা,মাথার বেন্ট বের হয়েছে । সেই ফ্যাশনেই আমার মা আমাকে সাজিয়েছেন। আম্মু ঈদে দুটি করে জামা দিতেন। সাথে নানা বাড়ীর উপহারতো ছিলই। ছোটবেলা থেকেই আম্মু আমাকে মাথার হেট,লং স্কার্ট এগুলো দিয়ে আমাকে সাজাতেন। আব্বুর দিনলিপিতে ২৭.৯.১৯৮৫ ইং তারিখে লিখেছেন, ‘নারায়ণগঞ্জ হাইস্কুলে জেবুনকে নিয়ে গেলাম ছোটদের আবৃত্তি প্রতিযোগিতায় জন্য। প্রধান শিক্ষকের কক্ষে নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার চেয়ারম্যান নাজিমউদ্দিন মাহমুদের সাথে সাক্ষাৎ হলো। তিনি বললেন, কবি সাহেবের মেয়ে প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের পোশাক মিলিয়ে পড়েছে। জেবউন আমার লেখা ‘আমি বাঙ্গালী’ কবিতাটি পড়ে শোনালো।’

আমি যে বাড়ীতে বড় হয়েছি সে বাড়ীটি দাদু তৈরী করেছিলেন আব্বুর জন্মের আগে। দোতলায় ছিল উঠোন। সে উঠোনে ছিল দাদুর সময়কার কাঠের হাতলয়ালা লম্বা চেয়ার। যৌথ পরিবারের বড় হয়েছি। এক উঠোনে চাচাত ভাই বোনের সাথে মিলে সময় কাটিয়েছি। মনে পড়ে আমার তিন ফুফুর ছেলেমেয়েরা যখন আসত। তখন বাড়ীটা মনে হতো একটা আনন্দবাড়ী। বাড়ীর দোতলা উঠোনের সেই চেয়ারে দাদী বসতেন আর আমরা সবাই বসে গল্প করতাম। সেসব সুখ স্মৃতি ভুলে যাবার মত নয়।

ছোট চাচা ৮০ দশক থেকে ঘরোয়া দাবা প্রতিযোগিতার আয়োজন করতেন। নাম ছিল খাজা দাবা টূর্নামেন্ট। যে প্রতিযোগিতায় পাঁচ বছর বয়স থেকে কবিতা আবৃত্তি করতাম। পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হতো নারায়ণগঞ্জের আলী আহমদ চুনকা পৌর পাঠাগারে। সে অনুষ্ঠান শুরুতে কোরআন তেলাওয়াত করেছি। আমাদের বাড়ীতে আয়োজিত হতো এই প্রতিযোগিতা। সেই সুবাদে জাতীয় আঞ্চলিক পর্যায়ে দাবাড়–দের আমাদের বাড়ীতে যাতায়াত ছিল। আমাদের বাড়ীতে দেশের প্রখ্যাত গীতিকার,সংগীত শিল্পীদের ও আসা যাওয়া ছিল। এর মধ্যে গীতিকার এবং চলচ্চিত্রকার গাজী মাজহারুল আনোয়ারের সাথে আমাদের পরিবারের সখ্যতা ছিল। তিনি সপরিবারে আমাদের বাড়ীতে এসেছেন।

আব্বু ষাট দশকের কবি ও নাট্যকার মুঃ জালাল উদ্দিন নলুয়া। যার প্রকাশিত গ্রন্থ ১২টি ছাড়িয়ে গেছে। আমার মা লুৎফা জালাল প্রকাশিত তিনটি গ্রন্থের রচয়িতা । দু’জনেই বাংলা একাডেমী’র সদস্য। তবে একটি বিষয়ের অবতারণা না করলেই নয়,আমার জন্মপূর্ব থেকে আমাদের বাড়ীতে সাহিত্যের আসর বসত। যেখানে আসতেন স্বনামধন্য কবি সাহিত্যিকবৃন্দ।

তিন বছর বয়সেই কবিদের দেখলে আমি ‘সাহিত্য সভা’ বলতাম। আমাদের বাড়ী থেকে এক মিনিটের ব্যবধানে নলুয়া উত্তর জামে মসজিদ। মসজিদের পাশেই আমাদের সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়। ছয় বছর বয়স হবার কয় মাস পূর্বে স্কুলটিতে তৃতীয় শ্রেণীতে ভর্তি হই। স্কুলের সহপাঠীরা আমার চেয়ে বেশীর ভাগ বয়সে বড় ছিল বলে স্কুলে বন্ধুত্ব ছিল কম।

পাঁচ বছর বয়স না হতেই কবিতা আবৃত্তিতে দুটি পুরস্কার লাভ করি। এরপর থেকে পিছন ফিরে তাকাইনি। বাবা মায়ের হাত ধরে নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকা পর্যায়ে বিভিন্ন সংগঠন কর্তৃক আয়োজিত প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেছি এবং বেশীরভাগ সময় বিজয়ী হয়েছি। জাতীয় শিশু পুরস্কার প্রতিযোগিতায় ঢাকা জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে কবিতা আবৃত্তি ও শিশু সাহিত্য জিজ্ঞাসা প্রতিযোগিতা, নারায়ণগঞ্জ উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে রচনা প্রতিযোগিতায় শীর্ষস্থান দখল করেছি। ছয় বছর বয়সে ৪১ লাইনের কবিতা আবৃত্তি করে সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণীর ছাত্রছাত্রীদের পরাজিত করে বিজয়ী হই। তৎকালীন সময়ে নারায়ণগঞ্জ জেলা পর্যায়ে বিভিন্ন সাহিত্যানুষ্ঠানে আব্বুর সাথে গিয়েছি কখনও প্রতিযোগি,কখনো সঞ্চালক এবং কখনো দর্শক হিসেবে। তবে বেশীর ভাগ সময়ে প্রতিযোগি হিসেবে অংশগ্রহণ করতাম এবং বিজয়ী হয়ে ফিরতাম। তন্মধ্যে কিশলয় লেখক গোষ্ঠী, অনির্বাণ লেখক গোষ্ঠী,মিতালী গোষ্ঠী, নিতাইগঞ্জ চলন্তিকা ক্রীড়া চক্র, শীতলক্ষ্যা ছাত্র-যুব সংঘ, শীতলক্ষ্যা মুক্ত স্কাউট দল, নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাব কলেজ লাইফ, রেলওয়ে সূর্য সারথি সামাজিক সংসদ, হিজল তমাল, স্বরবর্ণ প্রকাশনী, সংশপ্তক থিয়েটার,কল্যাণী, সাহিত্য জোট, শ্বেত পায়রা, ভিকটর্স, শীতলক্ষ্যা ক্রিকেট ক্লাব, ইউনেস্কো ইয়ুথ ক্লাব অব নারায়ণগঞ্জ, উজ্জীবন, নবারূন সাহিত্য পরিষদ, বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সাংস্কৃতিক কমান্ড ঢাকা, কায়কোবাদ সাহিত্য মজলিশ ঢাকা, জাতীয় শিশু পুরস্কার প্রতিযোগিতা, বাংলাদেশ বেতার কর্তৃক আয়োজিত জাতীয় শিশু পুরস্কার প্রতিযোগিতা এবং নতুন কুড়িঁতে অংশগ্রহণ ছিল মনে রাখার মত। জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে অর্জন করি শতাধিক পুরষ্কার। কবিতা আবৃত্তি প্রতিযোগিতা ছাড়া ও অভিনয়, গল্প বলা, সাধারণ জ্ঞান,নাতে রাসূল, রচনা প্রতিযোগিতা, বক্তব্য প্রতিযোগিতায় বহুবার বিজয়ী হয়েছি। ঢাকা থেকে প্রকাশিত সাংবাদিক যাযাবর মিন্টু সম্পাদিত ‘পালক, শ্রাবণ, ৯৭ সংখ্যায় দশ বছর বয়সে ‘শিশু শিল্পী’ হিসেবে সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। একই সময়ে ‘দৈনিক জনপদ’ পত্রিকায় শিশু শিল্পী হিসেবে সাক্ষাৎকার ছাপা হয়। সাংবাদিক যাযাবর মিন্টু তাঁর ‘স্বাধীনতার লড়াই’ গ্রন্থটি এক ঝাঁক শিশুর সাথে আমাকে ও উৎসর্গ করেন।

তবে শুধুমাত্র নিজে পুরস্কার আনতে বা অংশগ্রহণ করতে যেতামনা। দাদুর পুরষ্কার গ্রহণের জন্য দাদীর সাথে গিয়েছি সাড়ে পাঁচ বছর বয়সে। উল্লেখ্য, দাদু ভাই ছিলেন, বাংলাদেশের প্রথম আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রাপ্ত “জাগো হুয়া সাভেরা” র অভিনেতা এবং ঢাকা জাজের প্রাক্তন জোরার মরহুম মোঃ লিয়াকত হোসেন ওরফে কানু মিয়া সরদার’। তিনি চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য ‘সিরাজুল হক স্মৃতি পুরস্কার’ পেয়েছিলেন। আব্বু নারায়ণগঞ্জ জেলা সরকারী পাবলিক লাইব্রেরী কর্তৃক আয়োজিত জেলা একুশে সাহিত্য প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হন। সে পুরস্কার গ্রহণের সময় আব্বুর সাথে গিয়েছি ছয় বছর বয়সে। আমার জন্মদিন প্রতিবছর পালন করা হতো এবং র্কাড ছাপিয়ে অতিথিদের আমন্ত্রণ করা হতো। মিলাদ মাহফিল পড়ানো হতো। জন্মদিনের অনুষ্ঠানে সব সময় নারায়ণগঞ্জ এবং ঢাকার বিশিষ্ট কবি সাহিত্যিকবৃন্দ আসতেন। মনে পড়ে নবম জন্মদিন পালনের কথা। সেইবার আত্মীয় স্বজন এবং কবি সাহিত্যিক উপস্থিত ছিলেন। সাহিত্যিক কাকুরা আমাকে অনেক উপহারের সাথে সোনার আংটি ও উপহার দিয়েছিলেন। ৩.৩.৮৯ ইং তারিখে আমাদের বাড়ীতে ১৬ জন বিশিষ্ট কবি সাহিত্যিকদের সামনে আমি আমার লেখা প্রথম কবিতা ‘রক্তে আঁকা পতাকা’ আবৃত্তি করে লেখালেখির জগতে পদার্পন করি। ২৬.০৪.১৯৯২ইং তারিখে ‘বৃষ্টির ছড়া’ নামক চার লাইনের ছড়াটি ঢাকা থেকে প্রকাশিত ‘প্রতিভা বিকাশ’ ম্যাগাজিনে শ্রাবণ,১৩৯৭ সংখ্যায় মুদ্রিত হয়। অতঃপর প্রথম অনুগল্প ‘অসহায় পথশিশু মিনির গল্প’ লিখি ২২.০৫.১৯৯৪ইং তারিখে পরবর্তীতে সে গল্পটি নন্দিনী প্রকাশনা থেকে অণুগল্প সমগ্র ‘অতশী’ তে প্রকাশিত হয়েছে। স্থানীয় বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় আমার লেখা স্কুল কলেজের পড়াকালীন প্রকাশিত হয়।

মনে পড়ে স্কুলে শপথ বাক্য পাঠ করতাম। সেজন্য আমাকে প্রতিদিন স্কুলে আধ ঘন্টা আগে পৌঁছাতে হতো। আব্বুর লেখা ‘বিদায়’ কবিতাটি প্রতিবছর এসএসসি এবং এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের বিদায় অনুষ্ঠানে পাঠ করতাম। এই কবিতাটি ঢাকা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের একজন মহাপরিচালকের বিদায় অনুষ্ঠানে ও আবৃত্তি করেছি। আব্বু ঢাকায় চাকুরী করতেন থানা শিক্ষা অফিসে। ঢাকায় যত অনুষ্ঠানে এসেছি আব্বুর হাত ধরে। কখনো ট্রেনে কখনো বাসে চড়ে সেই ছয় বছর বয়স থেকে।

আমি স্কুলে খেলতে চাইতাম না। খেলতে চাইনি বলে একবার টিফিন পিরিয়ডে আমার এক সহপাঠী আমাকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেয় এবং সে ধাক্কায় বেঞ্চের কোণায় আঘাত লেগে আমার মাথা ফেটে যায়। বলতে সংকোচ নেই আমার সকল বিষয়ে কম বেশী পুরস্কার অর্জনের সনদপত্র থাকলেও আমি খেলাধূলায় কোন সনদপত্র পাইনি। স্কুলে কবিতা আবৃত্তি করে প্রতিযোগিতায় অনেকবার ১ম স্থান অর্জন করি। তবে ‘যেমন খুশী তেমন সাজো’তে আমি পুরস্কার পেয়েছিলাম। একবার সেজেছিলাম রোভার স্কাউট লিডার। আর একবার সেজেছিলাম সাংবাদিক। আব্বু রোভার স্কাউট লিডার ছিলেন বলে বাড়ীতে থাকা আব্বুর পোশাক পরে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেছিলাম। তবে একেবার যে খেলাধূলা করিনি তা নয়। বাড়ীতে ভাইদের সাথে ইনডোর গেমস খেলতাম যেমন-ক্যারম,দাবা,বাগাডুলি, ব্যাডমিন্টন, মানচিত্র মিলানো। শখ ছিল দেশ-বিদেশের ষ্ট্যাম্প সংগ্রহ করা। অবসরে গান শুনতাম। আব্বুর সংগ্রহে রাখা বইগুলো পড়তাম। তবে বেশী ঝোঁক ছিল ’বেগম’ পত্রিকার প্রতি। আমাদের বাসার বইয়ের তাকের একটি অংশ জুড়ে ছিল ‘বেগম’ পত্রিকা। আম্মু ‘বেগম’ পত্রিকা থেকে সেলাই করার জন্য বিভিন্ন ফুল কার্বন কাগজের মাধ্যমে টেবিল ক্লথ, টেলিভিশনের কভার এবং কামিজের সামনে সেলাই করার জন্য ‘বেগম’ পত্রিকায় প্রকাশিত ফুলের সাহায্য নিতেন। আম্মুর সাথে সাথে আমি ও শিখেছিলাম হেম ষ্ট্রিচ,কাথাঁ ষ্টিচ,ব্রড ষ্টিচ। আমি যতটুকু খেলাধূলা করেছি ভাইদের সাথে। আমার ভাইয়েরাই ছিল আমার খেলার সাথী। তিন ভাইয়ের এক বোন ছিলাম আমি। কোনদিন বোনের অভাব বুঝিনি। তবে জীবনের এই পর্যায়ে এসে একজন বোনের অভাব আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়।

আমার জীবনে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাগুলোতে নতুন অভিজ্ঞতায় পড়তে হয়েছে। যেমন- পঞ্চম শ্রেণীতে সেন্টার পরীক্ষা, এসএসসি তে টাস্কফোর্স ভিত্তিক পরীক্ষা। এইচএসসি তে সকল বোর্ডে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা এবং চার বছর ভিত্তিক অনার্স প্রথম ব্যাচে ছিলাম আমি। ১৯৮৮ সনে পঞ্চম শ্রেণীতে সেন্টার পরীক্ষা দেই। পরীক্ষা কেন্দ্র পড়ে গণবিদ্যা নিকেতনে । প্রতিটি পরীক্ষা দিতে গিয়েছি আম্মুুর সাথে। আগেই বলেছি, আব্বু ঢাকায় সরকারী চাকুরী করতেন। মনে পড়ে, এসএসসি পরীক্ষার সাত দিন আগে জল এবং গুটি বসন্তের কবলে পড়ি। বাড়ীর সবার সে কি দুশ্চিন্তা। কিন্তু আমি সবসময় পড়া আগে পড়ে রাখতাম বলে আমার অসুস্থতা আমাকে ছুঁতে পারেনি। এসএসসি পরীক্ষা দেই মর্গ্যান বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের যে ভবনে, আব্বু ১৯৬৫ ইং ঐ একই ভবনে পরীক্ষা দিয়েছিলেন। এইচএসসি পরীক্ষার কয়েকদিন আগে জন্ডিসে আক্রান্ত হই। কিন্তু লেখাপড়ার প্রতি অসীম দরদের ফলে এবার ও আমি আটকে থাকিনি। সেবার ছিল ফল বির্পযয়ের বছর। ঢাকা বোর্ডে ১,৭৩,৬৪০ জন পরীক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়। তন্মধ্যে ১,১০,৭৫২ জন পাশ করে। তার মধ্যে ২০৫০ জন প্রথম বিভাগে উত্তীর্ন হয়। সেই প্রথম বিভাগ প্রাপ্তদের মধ্যে ছিলাম আমি একজন এবং নারায়ণগঞ্জ জেলা পর্যায়ে সর্বোচ্চ সংখ্যক নম্বর পাই মানবিক বিভাগে। এইচএসসি পাশ করেছি নারায়ণগঞ্জ আদর্শ বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজ থেকে। আম্মু ছিলেন কলেজের প্রথম ছাত্রী। আমি যখন সপ্তম শ্রেণীতে স্কুলে ক্লাশ করতাম। তখন আম্মু কলেজে ক্লাশ করতেন। স্কুলে আমাদের পোশাক ছিল কমলা রং এর। কলেজে ছিল সাদা রং এর। আমি আর আম্মু দুজনে দুই রং এর ড্রেস পরে সকালে চলে আসতাম । মনে পড়ে নবম শ্রেণীতে স্কুলের শ্রদ্ধেয় জিনাত ম্যাডাম বলেন, তোমরা যারা মোটামুটি ফল করবে তারা আমাদের কলেজে ভর্তি হবার চেষ্টা করো। আমি দাঁড়িয়ে বলেছিলাম ম্যাডাম, আমি যত ভালো ফলাফল করিনা কেন আমি এই কলেজেই পড়বো। আমি কথা রেখেছিলাম। মনে পড়ে, এইচ এস সি পরীক্ষার ফলাফলের কথা শুনে কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষক মাহমুদা আকতার ডলি ম্যাডাম আমাদের বাসায় আসেন। তিনিই প্রথম আমাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার জন্য উৎসাহ প্রদান করেন এবং রোকেয়া হলের ছাত্রী হবার স্বপ্ন দেখান। একটা কথা না বললেই নয়। আমি কখনোই স্কুলে এবং কলেজে গৃহশিক্ষকের কাছে পড়িনি। আম্মু পড়াতেন সব বিষয়। আব্বু পড়াতেন ইংরেজী। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য ও কোন কোচিং করিনি। নিয়মিত পত্রিকা পড়তাম, দুইটি ভর্তি গাইড অনুসরণ করে পড়তাম, সংবাদ শুনতাম। ভর্তি পরীক্ষা দিতে গিয়েছি আব্বুর হাত ধরে বদরুন্নেসা সরকারী মহিলা কলেজে। উত্তীর্ণ হলাম ‘খ’ ইউনিট থেকে। ভর্তি হলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে লোক প্রশাসন বিভাগে।

আমার ছেলেবেলা ছিল বলাকার মতো শুভ্র, নদীর জলের মত চিকচিকে রুপালী, সূর্য়ের আলোর মতো সোনালী। আমার জীবন সুধা আজ পরিপূর্ণ। আমার বাবা মায়ের জন্য । তাঁদের হৃদয়ের অপরিসীম দরদ নিয়ে তারা আমাকে বড় করেছেন। যার ঋণ শোধ করার মত নয়। এমন একটি পরিবারে জন্ম হয়েছে বলে আজ আমি দু’এক লাইন কবিতা লিখি,প্রবন্ধ লিখি। কবিতা আমার প্রাণ,সাহিত্য আমার ধ্যাণ ধারণা। আমি নিজেকে ধন্য মনে করি এজন্য যে, আমি পারিবারিক পরিমন্ডলে যতটা আদর ভালোবাসা পেয়ে বড় হয়েছি। ঠিক তেমনি আব্বুর বন্ধু বান্ধব সাহিত্যিক কাকু আব্বুর সহকর্মী এবং আমার প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে উচ্চ মাধ্যমিক র্পযন্ত সকল সম্মানিত শিক্ষকগণ আমাকে তাদের ভালোবাসা বিলিয়ে দিয়েছেন। এমন একটি সমৃদ্ধ ছেলেবেলা পেয়েছি বলে লাখো শুকরিয়া রাব্বুল আলামীনের কাছে। আব্বু আম্মু একজন নারী বা কন্যা হিসেবে আমাকে বড় করে তুলেননি। একজন মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছেন। না বললেই নয় আব্বুর দিনলিপি পড়ে দেখেছি যতবার আব্বু আমার কথা লিখেছেন ততবার আমাকে ‘আব্বু জেবউন’ বলে সম্বোধন করে লিখেছেন। নারী পুরুষের বৈষম্যের এই সমাজে আমি পেয়েছি বৈষম্যমুক্ত মনোভাব সম্পন্ন পরিবার । আমার শৈশব যে বাড়ীতে কেটেছে সে বাড়ীটি আমাদের চারভাইবোন কে আব্বু সমান অংশ দিয়েছেন।

শুরুতেই বলেছি আমাদের বাড়ী ‘সাহিত্যাঙ্গণে’র ঘরোয়া সাহিত্য সভায় আসতেন দেশের কবি সাহিত্যিকবৃন্দ। আমি তাদের সবাইকে ‘কাকু’ বলে সম্বোধন করতাম। কাকুরা যখন আসতেন তখন আমাকে অটোগ্রাফ দিয়ে যেতেন। এর মধ্যে যে অটোগ্রাফটি আমাকে ছুঁয়ে যায় সেটি হলো কবি, ছড়াকার শিশু সাহিত্যিক রফিকুল হক দাদু ভাই এর । ২১.১২.২০০১ইং তারিখে আমাদের বাড়ী ‘সাহিত্যাঙ্গণে’ এসেছিলেন। তিনি আমাকে একটি অটোগ্রাফ দিয়েছিলেন। সেটা দিয়ে আমি আমার ছেলেবেলার সমাপ্তি টানবো-

জেবউননেছা, লিজা নাকি জেবা,

সঠিক করে বলতে পারে কেবা?

জেবাই হোক লিজাই হোক কি আর আসে যায়
জেবউননেছার জীবন যেন সফলতা পায়।’

পুনশ্চ: লেখাটি বাংলাদেশ লেখিকা সংঘ কর্তৃক ‘আমার ছেলেবেলা’ গ্রন্থে ২০১৮ইং সনে প্রকাশিত হয়েছে

লেখক: ড. জেবউননেছা
সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান,
লোকপ্রশাসন বিভাগ,
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..

 

Copyright © All rights reserved © 2019 Kansatnews24.com
Theme Developed BY Sobuj Ali
error: Content is protected !!