মঙ্গলবার, ০৪ অগাস্ট ২০২০, ০৩:১৮ পূর্বাহ্ন

সোনালী স্মৃতিময় ছেলেবেলা-আত্মজীবনী পর্ব-২

ড. জেবউননেছা
  • আপডেট টাইম বৃহস্পতিবার, ১৪ মে, ২০২০
  • ৫১ বার পঠিত

আত্মকথা লেখা বড় কঠিন কাজ। প্রতিদিনের হাজারো ঘটনার স্বাক্ষী হয় জীবন। যে জীবনের হাজারো স্মুতি জমে থাকে জীবনের মোহনায়। জীবন সংক্ষিপ্ত হলে ও এর স্মৃতির জানালা, দরজা অগণিত। আমার আরশিতে আমাকে খুঁজতে গিয়ে দেখছি লাখো কোটি স্মৃতি উকিঁ দিচ্ছে জীবনের অলিতে গলিতে। কোনটা রেখে কোনটা বলি। অনেক স্মৃতি হারিয়ে যায় সময়ের বিবর্তনে। আজ লিখব হারিয়ে যাওয়া ছেলেবেলায় দেখা আমাদের এলাকার বিভিন্ন সংস্কৃতি এবং প্রথা,সেই সাথে নানা রকম সোনালী স্মৃতি। ‘প্রাচ্যের ড্যান্ডি’ নামে খ্যাত শিল্প নগরী নারায়ণগঞ্জ সদরথানার নিতাইগঞ্জের নলুয়া’য় আমার জন্ম। শীতলক্ষ্যা নদীর পাশে আমাদের গ্রাম। পুরনো শহর হিসেবে আমাদের প্রথাগুলো ও অনেক পুরনো। সেই সাথে সংস্কার ও।

ছেলেবেলা আব্বুর মুখ থেকে শুনেছি আমার দাদু ভাই আব্বুর ‘মুখে ভাত’ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেন। দোতলা বাড়ীর নীচতলার এক কক্ষে মুসলিম অতিথিদের জন্য এবং আর এক কক্ষে হিন্দু অতিথিদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করেছিলেন। কোরবানীর সময় দাদু ভাই মাংস বিতরণ করার সাথে মশলা কেনার জন্য পয়সা দিতেন। এসব রেওয়াজ পরবর্তীতে আব্বু পালন করেছেন। আমার চৌদ্দ বছরের ছোট ভাই জাবের বিন জালাল। তার জন্মের ছয়দিনের দিন মাথার চুল ফেলে সবাইকে আম্মু দাওয়াত দিয়েছিলেন। এই একই রীতি আমার বেলায় ও হয়েছিল। আট বছর আট মাসে যখন পবিত্র কোরান শরীফ হাতে নিলাম,সেদিন আম্মু ফিরনি রান্না করে সবাইকে বিতরণ করেছিলেন, মসজিদের হুজুর কোরান শরীফ আমার হাতে তুলে দেন।

ছোট ভাইদের সুন্নতে খৎনার দিন সকালে ধান,দুব্বা,হলুদ দিয়ে গোছল করানো হয়েছিল। এরপর সাতদিন পর্যন্ত আত্মীয় প্রতিবেশীর বাসা থেকে মিষ্টিখাবার আসতে থাকে। যেদিন সুন্নতে খৎনা করা হয়,সেদিন পায়েস বা ক্ষীর রান্না করে সবাইকে দেওয়া হয়। সুন্নতে খৎনা চলাকালীন মায়ের মাথার চুল একটি পাত্রে পানি নিয়ে সেখানে ভিজিয়ে রাখা হয়েছিল। এরপর যেদিন গোছল করা হয়,সেদিন জাকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠান করা হয়। সেই অনুষ্ঠানের নাম ‘মাথায় পানি’। আমার ছোট ভাইদের বেলায় এমনটি হতে দেখেছি। মনে পড়ে,দুই ভাই এর সুন্নতে খৎনা একসাথে হয়েছিল আর সাতদিন এত মিষ্টিজাতীয় খাবার এসেছিল যে আমাদের ফ্রিজ পূর্ণ হয়ে গিয়েছিল। আবার আব্বু আম্মু আশেপাশের কারো খৎনা হলে সেখানে ও মিষ্টিজাতীয় খাবার দিয়ে আসতেন।

বিয়ে অনুষ্ঠানে ও আমার কিছু বিশেষ স্মৃতি মনে পড়ে। যেমন,হলুদের দিন যে বাড়ী থেকে মেহেদী পাতা আনা হবে। সে বাড়ীর মেহেদী গাছের মালিককে পান সুপারি দিতে হয়। হলুদের দিন হলুদ শুরু হবার পূর্বে কনে বা বরের মাথার কাছে শীল পাটার পুতা রেখে সরিষাতেল ঢালা হয়। যে ঢালে তাকে তিনবার করে জিজ্ঞেস করা হয়, কার বর নামাও? যে ঢালতে থাকে সে বর/কনের নাম নিয়ে বলে তার বর নামাই। এতে নাকি অমঙ্গল দূর হয়। এরপর কনে অথবা বরকে বিয়ে হবার আগ পর্যন্ত সাত লোকমা দুধ ভাত খাওয়ানো হয়। কোন মাছ মাংস খেতে দেওয়া হয়না। আমার নানা বাড়ীতে দেখেছি হলুদ বাটার সময় গীত গাইতে । দেখেছি বিয়ের দিন সকালে বর অথবা কনের গোছলের পূর্বে রং ছিটাতে। মনে পড়ে বড় খালামণির ননদের বিয়ের দিন বিয়েবাড়ীর সবাইকে রং মাখামাখি করতে। আমি ভয়ে খাটের নীচে লুকিয়ে ছিলাম। বিয়ের দিন কনের বাড়ীতে বর যখন আসে তখন বর ফিতা কাটার পর পরই তার জুতা চুরি হয়ে যায়। এ কাজটি করে থাকে কনের ভাই বোনেরা। যে পর্যন্ত ‘বখশিস’ না দেওয়া হয় সে পর্যন্ত জুতা ফেরত পাওয়া যায়না। বরের খাবার আগে শ্যালক শ্যালিকারা হাত ধুইয়ে দেয়। একে আমাদের এলাকায় বলে ‘হাত ধোয়ানি’। মামা,খালা,চাচা আর ভাইদের বিয়েতে দেখেছি। বরকে আস্ত খাসি দেওয়া হয়। যেটা বরের ভাই বোন আর কনের ভাই বোন প্রতিযোগিতা করে খায়। বিয়ে পরানোর সময় বরের বাড়ীর একজন উকিল বাবা হয়। সে উকিল বাবা বিয়ের পরের দিন সকালে বর/কনের জন্য নাস্তা পাঠায়। বরের বাড়ীতে কনের বাড়ী থেকে মাছ দুধ,পান সুপারি সকালে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। বৌভাতের দিন বর চলে আসে শশুড়বাড়ী । তার পরদিন বর ভোর সকালে ঘুম থেকে উঠে বাজারে যায়। বাজার করে নিয়ে আসে। অইদিন বরের বাড়ীর লোকজন এসে কনেকে নিয়ে যায়। সেদিন নানা রকমের পিঠার আয়োজন করা হয়। আর এই অনুষ্ঠানের নাম ‘ফিরাউলি’। এরপর কনে বরের বাড়ীতে আট দিন থাকে। আটদিন পর যখন আসে তখন তাকে বলে ‘আট নাইওরী’। বিয়েতে সাধ্যমত কনেকে স্বর্ণ দিয়ে মুড়িয়ে দেন কনের বাবা মা। বরের বাড়ীতে কনের ঘর সাজিয়ে দেয় এবং এটা বরপক্ষকে উপহার হিসেবে দেওয়া হয়। ছোটবেলা থেকে এই সংস্কার পালন করতে দেখেছি। আমার বিয়েতে ও তাই হয়েছে। এরপর যখন বাচ্চা গর্ভে আসে। সাতমাসের সময় অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করা হয়। সে অনুষ্ঠানের নাম ‘সাধ’। বাবা মা প্রথমে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে । এরপর আত্মীয় স্বজন দাওয়াত করে এবং নতুন শাড়ী উপহার দেওয়া হয়। কনের মা বা বরের মা হবু মায়ের জন্য মিষ্টি পিঠা রান্না করে সে পিঠার নাম ‘চইপিঠা’।

মহররমের দিন আম্মু খিচুড়ী রান্না করতেন। জশনে জুলুশে ঈদে মিলাদুন্নবীর সময় এলাকা জুড়ে তোরণ নির্মাণ করা হয়। বাড়ীর পাশে বিরাট জমায়েত হয় এবং সে জমায়েতের সবাই সারা এলাকা জুড়ে শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। শোভাযাত্রা শেষ হলে মোনাজাতের ব্যবস্থা করা হয়। এলাকার মসজিদগুলোকে আলোকমালা দিয়ে সাজানো হয়। রাতে মসজিদগুলোতে মিলাদ পড়ানোর ব্যবস্থা করা হয়। পবিত্র শব-ই-মেরাজের সন্ধ্যায় মাগরিবের নামাজের পর মসজিদগুলোতে মিলাদের ব্যবস্থা করা হয়। সারা রাত মসজিদে নামাজ পড়েন মুসল্লীরা। আব্বুকে দেখেছি শব-ই মেরাজ,শব-ই-কদর এবং শব-ই-বরাতের রাতে এলাকার সব মসজিদে পালাক্রমে নামাজ পড়তে । শেষ রাতে সেহরী করে ফজর পড়ে ঘুমাতেন আব্বু-আম্মু। সাথে আমি ও সারারাত জেগে সেহরী করে ঘুমাতাম। পরদিন রোজা রাখতাম।

শব-ই-বরাতের দিন আম্মু রুটি হালুয়া বানাতেন, বিকালে সেই রুটি হালুয়া গরীব মিসকিনের নিকট বিতরণ করতেন। শুধু আম্মুই না,আমাদের এলাকার সবাই বিতরণ করতেন। আব্বু শব-ই-বরাতের দিন অফিস থেকে ফেরার সময় আমাদের ভাইবোনদের জন্য তারা বাতি আনতেন। সেগুলো জ¦ালাতাম। চাচাত ভাইবোনেরা ও সেই আনন্দে শামিল হতো।

রমজানের সময় সেহরীতে বাদ্যবাদকেরা গান করতে করতে আমাদের এলাকায় আসত। সেই গানের শব্দে ঘুম ভাংতো। সেহরীর পর আব্বু চলে যেতেন মসজিদে। ইফতারের সময় নানা আয়োজন করতেন আম্মু। ২৭ রমজানের সময় বড় চাচা এলাকার মুরব্বীদের খাওয়াতেন। আমার নানা ২৭ রমজানের রাতে মারা গিয়েছিলেন। অপরদিকে,নানী মারা গিয়েছিলেন, জুমাতুল বিদার সময়। সেজন্য নানা বাড়ীতে নানা নানীর জন্য মামারা ২৭ রমজানে মিলাদ এবং কোরান খতমের ব্যবস্থা করতেন।

আমার দাদু বাড়ী থেকে এক মিনিটের ব্যবধানে নলুয়া উত্তর জামে মসজিদ। মনে পড়ে ঈদের দিনের সকালে আব্বুর কন্ঠে ‘ঈদ মোবারক আসসালাম’ শুনে ঘুম ভাঙ্গতো। আব্বু সবাইকে ঈদের শুভেচ্ছা দিতেন এবং ঈদ জামাতে আহবান করতেন। সেই মসজিদে আমি ঈদের কবিতা পাঠ করেছি। তখন আমার বয়স হবে চার কি পাঁচ। ঘুম থেকে উঠে দেখতাম আম্মু সেমাই রান্না করে ফেলেছেন। সেই সেমাই আব্বু মসজিদের ইমাম সাহেবের জন্য নিয়ে যেতেন ফজরের পর পরই। দাদীর জন্য আব্বু নিজ হাতে সেমাই নিয়ে যেতেন। আম্মু একধরণের সেমাই তৈরী করতেন। যেটিকে বলা হয় মেশিনের সেমাই। ঈদের কয়দিন আগে মেশিন দিয়ে বানিয়ে রাখতেন। ঈদের দিন সে সেমাই রান্না করতেন।

ঈদুল আযহাতে ও একই রকম ভাবে ঘুম ভাংতো। আমাদের এলাকা একটি গরুর হাটে পরিণত হতো। কে কত বড় গরু আনতে পারে একটা প্রতিযোগিতা হতো আমাদের এলাকায়। কিন্ত আব্বু কোনদিন প্রতিযোগিতা করতেননা। আব্বু তার সাধ্যের মধ্যেই কিনে আনতেন গরু। আমরা তাতেই তৃপ্ত হতাম। একবার আব্বু ঈদের কয়েকদিন আগে দুটি খাসী এনেছিলেন। এর মধ্যে খাসী একটি ঈদের আগেই মারা গিয়েছিল। আমি খুব কষ্ট পেয়েছিলাম, কেঁদে ও ছিলাম অনেক। এরপর থেকে আব্বু আর কোন দিন ও খাসী কোরবানী দেননি।

পহেলা বৈশাখের দিন আম্মু পোলা ও মাংস রান্না করতেন। আমাদের এলাকায় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে সকালেবেলা মিলাদ পড়িয়ে মিষ্টি বিতরণ করে ব্যবসায়ীরা। কেউ কেউ ‘শুভ হালখাতা’ লিখে র্কাড ছাপিয়ে নিমন্ত্রণ করত। আমাদের বাসায় আব্বুর ব্যবসায়ী বন্ধু ,আম্মুর চাচা সবসময় কার্ড পাঠাতেন আবার বিকেলে মিষ্টি পাঠিয়ে দিতেন।

ছেলেবেলা আব্বুর সাথে যখন লক্ষ্যার পাড়ে যেতাম। যাবার পথে নদীর খুব কাছে একটি শিশু পার্ক ছিল (যা এখন নেই)। নদী থেকে ঘুরে ফেরার পথে সেই শিশু পার্কে খেলাধূলা করেছি। এই শিশু পার্কের একটি ভবনে আব্বুর লেখা নলুয়া মহল্লার ইতিহাসভিত্তিক ‘ঐতিহ্যের সিড়ি বেয়ে’ নামক’ গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন হয়েছে। আব্বু ষাট দশকের কবি ও নাট্যকার মুঃ জালাল উদ্দিন নলুয়া। আব্বুর নেতৃত্বে দাদুর হাতে গড়া দোতলায় উঠোন সম্বলিত বাড়ীতে ৭০ দশক থেকে ঘরোয়া সাহিত্য সভার আসর বসত। যে সাহিত্য সভায় এসেছেন ইমদাদুল হক মিলন,মুজিবুল হক কবীর এবং রুহুল আমীন বাবুল,জালাল উদ্দিন রুমি,রফিকুল হক দাদুভাই এর মত দেশের খ্যাতনামা কবি – সাহিত্যিকবৃন্দ। আমার হাইস্কুলের ঠিক পিছনে ছিল জিমখানা মাঠ। যেখানে আব্বুর সাথে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছি। মনে পড়ে আব্বুর সাথে রেলওয়েতে সূর্যমুখী সংগঠনের অনুষ্ঠানে গিয়েছি। জ্ঞান হবার পর থেকে আলী আহমদ চুনকা মিলনায়তনে আব্বুর লেখা নাটক উপভোগ,সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান,আবৃত্তি প্রতিযোগিতা এবং অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করার জন্য কতবার গিয়েছি তা হিসেব করা বলা কঠিন। মিলনায়তনের দোতলায় আমার দু’বছর বয়সে আব্বুর লেখা একুশ ভিত্তিক নাটক ‘বাংলা আমার বাংলা’ মঞ্চস্থ হয়েছে। যে নাটকটি অমর একুশে বইমেলা-২০১৮ই তে অনন্যা প্রকাশনী থেকে আমার সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছে। মায়ের কোলে বসে সে নাটক উপভোগ করেছি। এই মিলনায়তনে আমার আম্মু লুৎফা জালাল রচিত ‘অলংকার’ কাব্যগ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন হয়েছে। একই মিলনায়তনেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্বর্ণপদক প্রাপ্তির পর ‘জাগ্রত বিবেক’ সংগঠন আমাকে সংবর্ধিত করেছে। যে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বর্তমান সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ও তৎকালীন পৌরসভার চেয়ারম্যান এবং ডাঃ সেলিনা হায়াত আইভি এবং বিভিন্ন ওয়ার্ডের কমিশনারবৃন্দ।

বছরে একবার বাড়ীর দোতলায় ‘খাজা দাবা টুর্নামেন্টে’র আসর বসত। সে বাড়ীর দোতলার রাস্তা বরাবর কক্ষটিতে বাস করতেন আমার দাদী। দাদী সে কক্ষে কালো ফ্রেমের চশমা পড়ে বসে থাকতেন। আমরা পথে যেতে আসতে দাদীর শুভ্র মুখটি দেখতে পেতাম। আমার দাদী দেশের খ্যাতনামা কলামিষ্ট ও ছায়ানটের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ওয়াহিদুল হক সাহেবের ফুফু। দাদু বাড়ী থেকে পাঁচ মিনিটের পথ মাছুয়াবাজার। লক্ষ্যার তীর ঘেষে সে কাচাঁবাজার। যে কাচাঁবাজারের তাজা সবজি,মাছ-মাংস খেয়ে বড় হয়েছি।

দাদু বাড়ী থেকে প্রায় আট মিনিটের পথ শীতলক্ষ্যা ক্রিকেট ক্লাব। সে ক্লাবের উপদেষ্টা ছিলেন আব্বু। মনে পড়ে কুমুদিনি মাঠে ক্রিকেট খেলা অনুষ্ঠিত হতো। সে খেলায় শখের বশে ভাষ্য দিতো আমার ছোট ভাই প্রকৌশলী মোঃ জাকারিয়া জালাল। শীতলক্ষ্যার তোলারাম মোড়ে আব্বুর লেখা নাটক ‘ভেজাল থেকে ভেজাল’ মঞ্চস্থ হয়েছিল।

দাদু বাড়ী থেকে ১৫ মিনিটের পথ আদর্শ উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজ। যে স্কুল ও কলেজের ছাত্রী ছিলাম আমি। স্কুলে প্রতিদিন মাইকে শপথ বাক্য পাঠ করতাম আমি। স্কুলে যেতাম নিতাইগঞ্জের পথ অতিক্রম করে। যে পথের দু ধারে ছিল আটা,ময়দা ও লবণের ফ্যাক্টরী।

মনে পড়ছে আজ নানা বাড়ীর সে বকুল তলার কথা। ছোট খালার সাথে হাতে হাত মিলিয়ে ঘুরে বেরিয়েছি সবুজের প্রান্তরে। ছোট একটা নদী পার হয়ে সবুজের দু’প্রান্ত ছুঁেয় নানা বাড়ী। নানা বাড়ীর পাশে শান বাধাাঁনো ঘাট। অপর পাশে চোখ ধাধানো হলুদ সর্ষে ক্ষেত। কি অপরূপ দৃশ্য! নানীর হাতে রান্না কতইনা মজার ছিল। নানা বাড়ীর বড় ঘরের সামনে রাস্তার পাশে আম গাছ,পেয়ারা গাছ। গ্রীষ্মকালে নানী আমাদের জন্য সে গাছের আম পাঠাতেন। পাঠাতেন নানীর হাতে তৈরী করা আমের মোরব্বা,পাকা পেয়ারা। তবে তখনকার সেই আম ও পেয়ারা ছিল সম্পূর্ণ কেমিক্যালমুক্ত। স্বাদ ছিল অমৃতের মতো। শীতকালে নানী তার হাতে তৈরী করে পাঠাতেন পাটিসাপটা পিঠা,ভাপা পিঠা, তেল পিঠা ও দুধে ভেজানো চিতই পিঠা। আহা! কি সুস্বাদু ছিল সে খাবারগুলো! কালের আবর্তনে নানা বাড়ীর সে বাড়ীটি ভেঙ্গে তিন মামা আলাদা করে তাদের বাসভবন করেছেন। সে গড়ে উঠা বাসভবন কেড়ে নিয়েছে আম আর পেয়ারা গাছের জীবন। প্রকৃতির নিয়মে আমার ছোট খালা, নানা-নানী ওপারে তাদের গন্তব্য স্পর্শ করেছেন। আমার বড় মামা যিনি কিনা তার নিজ সন্তানের চেয়ে আমাকে বেশী ভালোবেসেছেন,সে মামা ও নিষ্ঠুর ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে আমাদের কাছ থেকে ছুটি নিয়েছেন। মামার মৃত্যুর সন্ধিক্ষনে আমার শরীরের রক্ত সিরিঞ্জের মাধ্যমে টিপ টিপ করে প্রবেশ করছিল। আমার রক্ত তার ক্ষয়ে যাওয়া জীবনটাকে আটকে রাখতে পারেনি। সে ও বন্ধুত্ব করেছে ওপারের সব যাত্রীর সাথে। বিন্দু বিন্দু সবার ভালোবাসায় আমার জীবন যে আলোড়িত তার প্রমাণ বহন করে নানা বাড়ীর সবার কাছ থেকে পাওয়া অকৃত্রিম,অকৃপণ ভালোবাসা আর স্নেহ থেকে।

আমার দাদু বাড়ী, যে বাড়ীতে আমার জন্ম হয়েছে। সে উঠোনসমৃদ্ধ দোতলা বাড়ীর নীচতলায় থাকতাম আমরা। সেখান থেকে বাড়ীর উঠোনে দেখতাম শরীফা ফল,জাম্বুরা,পেয়ারা,বড়ই,পেপে,নারকেল ও কলা গাছ। কচি শরীফা ফল গাছে দেখলে অপেক্ষা করতাম কবে এই শরীফাটি খাব। ওদিক দিয়ে যে বড়ই গাছটি মাথা উচুঁ করে থাকত,ছেলেবেলায় সে গাছটিকে মনে হতো পাহাড় সমান। এত বড়ই খেয়েছি এ গাছটি থেকে তা হিসেব করে বলা কঠিন। আশেপাশের বাড়ীর মানুষেরা ও আমাদের গাছের বড়ই খেত। সে গাছগুলোর ফাকেঁ ফাকেঁ দুপুরের রোদ এসে পড়ত আমার চোখে। আমি আন্দোলিত হতাম। সময়ের কঠিন নিয়মে আমাদের দোতলা বাড়ীটি নেই। তবে সে দোতলা বাড়ীর গেটে ৭০ বছর বয়সী যে পাঁচটি গম্বুজ ছিল তার মধ্যে একটি গম্বুজ আম্মুর পরামর্শে ছোট ভাই মোঃ জান্নাতুল জালালের প্রচেষ্টায় আমাদের পাঁচতলা ভবনের চিলেকোঠায় প্রতিস্থাপিত করা হয়। সে স্থলে গড়ে উঠেছে তিনটি ভবন। কিন্তু কোথাও কোন সবুজের স্পর্শটুকু নেই। গড়ে উঠা নতুন ভবনগুলো আমার স্মৃতিঘেরা শৈশবের চিরচেনা পরিচিত গাছগুলোর জীবন কেড়ে নিয়েছে।

আমার ধ্যাণ-জ্ঞান-স্বপ্ন-ভালোবাসা-প্রেম নারায়ণগঞ্জ। সময়ের ব্যবধানে আর বাস্তবিক কারণে এই শহরের খুব কাছে রাজধানী ঢাকায় বাস করি ঠিকই। কিন্তু শয়নে স্বপনে দিবানিশি আমার প্রিয় শহর আমাকে সারাক্ষণ হাতছানি দিয়ে বেড়ায়। সারাসময় খুঁজে বেড়াই লক্ষ্যার সেই রোদেলা দুপুর,পড়ন্ত বিকেল আর বৃষ্টি ভেজা রাতের সোনালী স্মৃতি। পৃথিবীর যে প্রান্তে থাকিনা কেন শীতলক্ষ্যা বিজড়িত স্মৃতি কি হৃদয় থেকে বিচ্ছেদ করা যায়? এ যেন আমার জীবনের রঙ্গীন জলছবি। এ ছবি মুছে ফেলা যায়না। সব স্মৃতি এখন স্মৃতির রঙ্গীন এলবাম। সেই স্মৃতির এলবামের প্রতিটি ছবি আমার হৃদয়ে বহমান লক্ষ্যা নদীর মত আমৃত্যু বেচেঁ থাকবে।

আমার আরশিতে আমার বাড়ীর পাশে বয়ে যাওয়া শীতলক্ষ্যা নদী বয়ে চলেছে। আর সেই শ্রোতধারায় মিশে আমি যেন জীবন নদী থেকে সাগরের দিকে ছুটে বেড়াচ্ছি। বয়ে চলা নদী আর জীবন যেন একসূত্রে গেঁথে আছে আমার স্মৃতির ঝুলিতে।

পুনশ্চ: সুলতানা রিজিয়া সম্পাদিত ‘আমার আরশিতে আমি’ (১ম খন্ড) (২০১৮ইং) গ্রন্থে প্রকাশিত।

লেখক:
ড. জেবউননেছা
সহযোগী অধ্যাপক,
লোক প্রশাসন বিভাগ,
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
Copyright © All rights reserved © 2019 Kansatnews24.com
Theme Developed BY Sobuj Ali
error: Content is protected !!